সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন এবং বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ সংশোধন সংক্রান্ত দুটি বিল পাসকে ঘিরে জাতীয় সংসদে সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বাকযুদ্ধ হয়েছে। বিশেষ করে এসব প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের বয়সসীমা তুলে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়ে উভয় পক্ষ নিজেদের অবস্থান তুলে ধরেন।
বৃহস্পতিবার (৩০ এপ্রিল) ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত জাতীয় সংসদের অধিবেশনে ‘বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষ (আইডিআরএ) সংশোধন বিল ২০২৬’ ও ‘বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন সংশোধন বিল-২০২৬’ পাস হওয়ার পর সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে বাকযুদ্ধ হয়।
জাতীয় সংসদে ফ্লোর নিয়ে রংপুর-৪ আসনের সংসদ সদস্য আখতার হোসেন এ দুটি বিল নিয়ে বলেন, ‘মাত্রই দুইটা আইন এখানে পাস করা হলো। আমরা জানি যে সরকারি দল এখানে সংখ্যাগরিষ্ঠ, তারা যেভাবে চাইবেন সেভাবে আইন পাস হবে— সেটাই হাউজের বাস্তবতা। কিন্তু যে দুইটা আইন পাস করা হলো এবং যে জনমত যাচাইয়ের জন্য প্রস্তাবগুলো উত্থাপন করা হয়েছিল, যিনি সদস্য আছেন তিনিও এই আইনগুলোর বিষয়বস্তু কী, তার বক্তব্যের সময় সে বিষয়টা উল্লেখ করেন নাই।’
তিনি বিষয়বস্তুগুলো তুলে ধরে বলেন, ‘সিকিউরিটিস অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের আইনে ৬৫ বছরের বাধ্যবাধকতা ছিল চেয়ারম্যান ও সদস্যদের ক্ষেত্রে এবং বিমা উন্নয়ন ও নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের ক্ষেত্রে ছিল ৬৭ বছর। এই বাধ্যবাধকতাগুলো উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিলের দিকে তাকালে মনে হয় খুবই সংক্ষিপ্ত— কমা, সেমিকোলনের পরিবর্তে দাঁড়ি প্রতিস্থাপন হবে, শর্তগুলো বাদ যাবে। দেখে মনে হয় যেন কিছুই হচ্ছে না। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। মাননীয় অর্থমন্ত্রী বলেছেন যোগ্য ও দক্ষ লোক আনার জন্য এই পরিবর্তন। প্রশ্ন হলো— এটা কি কোনো ব্যক্তিকে মাথায় রেখে করা হচ্ছে, নাকি একটি নীতিকে মাথায় রেখে? যদি বিশেষ কাউকে মাথায় রেখে বয়সসীমা উঠিয়ে দেওয়া হয়, তাহলে তা যোগ্যতার কথার সঙ্গে কন্ট্রাডিকশন তৈরি করবে।’
আখতার হোসেন বলেন, ‘বিএনপি সরকার ২০০১ সালে ক্ষমতায় এসে প্রধান বিচারপতির বয়স বাড়ানোর যে সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, তার ফলে জাতিকে দীর্ঘ ভোগান্তি পোহাতে হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে বলছি— শেয়ার মার্কেটের মতো জায়গায় যদি নিজেদের লোক বসানোর উদ্দেশ্যে বয়সসীমা তুলে দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে লুটপাটের পরিবেশ তৈরি হতে পারে। এর দায় সরকারকেই নিতে হবে। আমরা আমাদের কনসার্ন জানিয়ে রাখছি। এখন দেখার বিষয়—কতটা সৎ, যোগ্য ও দক্ষ লোক নিয়োগ দেওয়া হয়।’
এর জবাবে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমার বক্তব্যে আমি পরিষ্কার করেছি এই বিল কেন আনা হয়েছে। ১৯৯৩ সালে যখন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন গঠিত হয়, তখন গড় বয়স ছিল ৫৭ বছর। এখন গড় বয়স ৭২ বছর। আপনি কি এই অভিজ্ঞ মানুষদের কর্মকাণ্ডের বাইরে রাখতে চান? বিশ্বের প্রায় সব দেশে সফলভাবে এই ধরনের কমিশন পরিচালিত হচ্ছে— সেখানে কোনো বয়সসীমা নেই। যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার প্রশ্নে বয়সের সীমাবদ্ধতা দিয়ে আপনি সীমাবদ্ধতা তৈরি করছেন। আমরা সেটা চাই না। অর্থনীতিকে প্রফেশনালি পরিচালনা করতে গেলে এই পরিবর্তন আনতেই হবে। এখানে ইমোশনের কোনো সুযোগ নেই।’
এ সময় জাতীয় সংসদের বিরোধী দলীয় নেতা ডা. শফিকুর রহমান ফ্লোর নিয়ে বলেন, ‘টাইম কনস্ট্রেইনের কারণে আমরা অনেক বিলের ক্ষেত্রে পূর্ণ অধিকার পাইনি। কিন্তু এই দুইটি বিলের ক্ষেত্রে সে রকম কোনো পরিস্থিতি ছিল না। তবুও আমাদের অধিকার খর্ব হয়েছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘সরকারের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর নিয়োগসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে যে পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন আছে। যদি এইভাবে যোগ্যতা নির্ধারণ হয়, তাহলে দেশ এগোবে কিভাবে?’
বিরোধী দলীয় নেতার প্রশ্নের জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, একটা বিল পাশ হওয়ার পরে এই ধরনের আলোচনা রুলস অব প্রসিডিউরের বাইরে। তবুও যেহেতু প্রশ্ন উঠেছে, উত্তর দিতে হচ্ছে।’
তিনি আরো বলেন, ‘বিএনপি সরকারের সময় বাংলাদেশ ব্যাংক ও সিকিউরিটিজ কমিশনে সব নিয়োগ নন-পলিটিক্যাল ছিল। সেই ধারাই আমরা বজায় রাখব। প্রধানমন্ত্রী ইতোমধ্যে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন— ফিন্যান্সিয়াল সেক্টরে কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বকে নিয়োগ দেওয়া হবে না। এটি বাংলাদেশের ইতিহাসে প্রথম।’
এরপর বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আবদুল্লাহ মুহাম্মদ তাহের ফ্লোর নিয়ে বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর এই সিদ্ধান্তকে আমরা স্বাগত জানাই। তবে বর্তমান বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের একটি রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে। যদি তা সত্য হয়, তাহলে প্রধানমন্ত্রীর সিদ্ধান্ত অনুযায়ী নতুন নিয়োগ দেওয়া উচিত।’
এর জবাবে অর্থমন্ত্রী বলেন, ‘কোনো দলকে সমর্থন করা মানেই দলের সদস্য হওয়া নয়। নির্বাচনি কার্যক্রমে সহায়তা করা মানে দলীয় ব্যক্তি হওয়া নয়। এভাবে দেখলে দেশে কাউকেই কোনো পদে নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে না।’









