বিশ্বব্যাপী ভিসা নীতির কড়াকড়ি এবং বাংলাদেশিদের অভিবাসন–সংক্রান্ত অনিয়মের কারণে ক্রমেই গ্রহণযোগ্যতা হারাচ্ছে বাংলাদেশের পাসপোর্ট। যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান হেনলি অ্যান্ড পার্টনার্স প্রকাশিত ২০২৫ সালের গ্লোবাল পাসপোর্ট সূচকে বাংলাদেশের অবস্থান ১০৬ দেশের মধ্যে ১০০তম। অর্থাৎ, বাংলাদেশের পাসপোর্ট বর্তমানে বিশ্বের সপ্তম দুর্বলতম পাসপোর্ট হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
বিশ্বের যেসব দেশ তাদের নাগরিকদের ভ্রমণ স্বাধীনতা বা ভিসা-মুক্ত সুবিধা দিয়ে থাকে, তাদের তুলনায় বাংলাদেশের নাগরিকরা বর্তমানে মাত্র ৩৮ থেকে ৪০টি দেশে ভিসা-মুক্ত বা আগমনে ভিসা সুবিধা পান। অথচ প্রতিবেশী ভারত এই সূচকে ৮০তম, শ্রীলঙ্কা ৯৫তম এবং নেপাল ৯৭তম স্থানে রয়েছে।
অর্থনৈতিক উন্নতি, তবু কূটনৈতিক দুর্বলতা
বাংলাদেশ গত এক দশকে অর্থনৈতিকভাবে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ দীর্ঘ সময় স্থিতিশীল ছিল, এবং রেমিট্যান্স প্রবাহও ছিল সন্তোষজনক। কিন্তু আন্তর্জাতিক ভ্রমণ স্বাধীনতার সূচকে এই অগ্রগতি প্রতিফলিত হয়নি।
বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশের পাসপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা কমে যাওয়ার মূল কারণ হলো—অভিবাসন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, ভিসার অপব্যবহার ও বিদেশে কিছু বাংলাদেশির অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড। অনেক দেশ অভিযোগ করেছে, বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি ভ্রমণ ভিসায় গিয়ে সেখানে অননুমোদিতভাবে কাজ করেন এবং নির্ধারিত সময়ের বেশি অবস্থান করেন। কেউ কেউ আবার সেই ভ্রমণ ভিসাকে কাজে লাগিয়ে তৃতীয় দেশে অবৈধভাবে প্রবেশের চেষ্টা করেন, যা আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী অপরাধ।
কঠোর নজরদারি ও ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেড়েছে
অভিবাসন বিশেষজ্ঞদের মতে, ইউরোপ, মধ্যপ্রাচ্য এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বেশ কয়েকটি দেশ এখন বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ব্যাপারে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করছে। ভিসা আবেদন যাচাইয়ের সময় এখন বায়োমেট্রিক ও ব্যাকগ্রাউন্ড চেক আরও কঠোরভাবে করা হচ্ছে। অনেক দেশ ভিসা ইন্টারভিউ বাধ্যতামূলক করেছে, আবার কেউ কেউ অনলাইন ভিসা আবেদনও সাময়িকভাবে স্থগিত রেখেছে।
“বাংলাদেশিদের একটি ছোট অংশের অনিয়মের কারণে পুরো জাতির ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে,” মন্তব্য করেছেন অভিবাসন বিশেষজ্ঞ মো. আরিফুল হক। তিনি বলেন, “ভ্রমণ ভিসা নিয়ে বিদেশে গিয়ে কাজ করা, বা অবৈধভাবে অবস্থান করা এখন বড় সংকট তৈরি করেছে। ফলে অনেক দেশ বাংলাদেশিদের ক্ষেত্রে ‘উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ’ ক্যাটাগরি ব্যবহার করছে।”
প্রভাব পড়ছে বৈদেশিক কর্মসংস্থানে
বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম শ্রম–রপ্তানিকারক দেশ। বর্তমানে প্রায় ১ কোটির বেশি বাংলাদেশি বিভিন্ন দেশে কর্মরত, যা দেশীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। কিন্তু ভিসা নীতির কড়াকড়ি এই খাতে নতুন চাপ সৃষ্টি করছে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মালয়েশিয়া, সৌদি আরব ও সংযুক্ত আরব আমিরাতে কর্ম ভিসা–সংক্রান্ত জটিলতা তৈরি হয়েছে। অনেক বাংলাদেশি রিক্রুটমেন্ট প্রক্রিয়ায় জাল নথি ব্যবহার, অতিরিক্ত ফি প্রদান ও দালাল চক্রের প্রতারণার শিকার হচ্ছেন। ফলে এসব দেশের সরকারও বাংলাদেশ থেকে শ্রমিক নেওয়ার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত যাচাই–বাছাই শুরু করেছে।
কি হতে পারে সমাধান
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাংলাদেশের পাসপোর্টের আন্তর্জাতিক মর্যাদা পুনরুদ্ধারে প্রয়োজন সরকারি ও বেসরকারি সমন্বিত উদ্যোগ। প্রথমত, বিদেশগামীদের জন্য প্রশিক্ষণ ও সচেতনতা বাড়াতে হবে—যাতে তারা ভিসার শর্ত লঙ্ঘন না করেন। দ্বিতীয়ত, রিক্রুটমেন্ট এজেন্সিগুলোর কার্যক্রমে কঠোর নজরদারি ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। তৃতীয়ত, বিদেশে আইন ভঙ্গকারীদের বিরুদ্ধে দ্রুত ও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া উচিত, যাতে আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তি পুনরুদ্ধার হয়।
কূটনৈতিকভাবে বাংলাদেশকে দ্বিপাক্ষিক ভিসা চুক্তি ও ‘লেবার মোবিলিটি অ্যাগ্রিমেন্ট’ বাড়াতে হবে, যাতে বিদেশি দেশগুলো বাংলাদেশি নাগরিকদের প্রতি আস্থা ফিরে পায়।
অর্থনৈতিক সাফল্য ও মানবসম্পদে সমৃদ্ধ দেশ হিসেবে বাংলাদেশের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ হলো আন্তর্জাতিক বিশ্বাসযোগ্যতা পুনরুদ্ধার করা। ভিসা অনিয়ম ও অভিবাসন সংকট মোকাবিলায় কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ না করলে ভবিষ্যতে বাংলাদেশের পাসপোর্ট আরও নিচে নেমে যেতে পারে। তাই এখনই সময়, ব্যক্তি ও রাষ্ট্র—উভয় পর্যায়ে দায়িত্বশীল আচরণের মাধ্যমে দেশের ভাবমূর্তি রক্ষা করার।









