সরকারের ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনার আওতায় রয়েছে এমন এলাকায় জমি ক্রয়-বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছে বিভাগীয় প্রশাসন। ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে জারি করা এক চিঠিতে সুস্পষ্ট এমন নির্দেশনা রয়েছে। কিন্তু এই নির্দেশনাকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে বিভিন্ন মৌজায় দেদারসে দলিল রেজিস্ট্রেশনের হিড়িক পড়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, সদর সাবরেজিস্ট্রার মো. জাহিদ হাসান ঘুষের বিনিময়ে সরকারের ঘোষিত মৌজায় অবৈধভাবে দলিল সম্পাদন করে চলেছেন রাখঢাক না করেই। চাঞ্চল্যকর এসব অভিযোগে সরগরম সোশ্যাল মিডিয়াও। এতে করে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও সরকারের ভূমি অধিগ্রহণ পরিকল্পনা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জানা যায়, ২০১৬ সালের ৫ অক্টোবর ময়মনসিংহ বিভাগীয় কমিশনারের কার্যালয় থেকে জারি করা এক চিঠিতে (স্মারক নম্বর: ০৫.৪৫.৬১০০.০০১.১৪.০০১.১৬-৪৫৬) স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়, ‘প্ল্যান অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সমূদয় ভূমি একসাথে অধিগ্রহণ করতে হবে। ইতোমধ্যে জমির ক্রয়-বিক্রয় যাতে বন্ধ থাকে এ বিষয়ে চিঠি ইস্যু করা রয়েছে।’ ওই চিঠিতে গোবিন্দপুর, পাড়ালক্ষীর আলগী, চর ভবানীপুর, জেলখানার চর, চর ঈশ্বরদিয়া, দুর্গাপুর, চরসেহড়া ও ময়মনসিংহ টাউন মৌজায় জমি রেজিস্ট্রেশন নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয় এবং জেলা রেজিস্ট্রারকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেওয়া হয়।
কিন্তু বিভাগীয় প্রশাসনের চিঠিকে তোয়াক্কা না করে মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ওইসব মৌজায় জমির দলিল রেজিস্ট্রেশনের ঘটনা ঘটছে অহরহ। এমনই কয়েকটি উদাহরণও মিলেছে সম্প্রতি। গত বছরের ২৫ নভেম্বর চর ভবানীপুর মৌজার ১৮০২৩ ও ১৮০২৪ নং দলিলের মাধ্যমে মো. দুলাল মিয়া ও ফারুক হোসেনের নামে জমি বিক্রি করেন সাজিদ আলী। এরপর চলতি বছরের ৩ মার্চ ৩৬৬৯ নম্বর দলিলে চর ভবানীপুর মৌজার ৫৩২৬ ও ৫৩৫২ দাগে ৬২ শতাংশ এবং গোবিন্দপুর মৌজার ১৪৮ ও ২৩৮ দাগে ৬৫ শতাংশ জমি আশরাফুল গংয়ের নামে রেজিস্ট্রেশন করা হয়। একই কায়দায় গত ২৩ জুন জেলখানার চর মৌজার ৩৬১০ দাগে মো. কামরুল ইসলাম গংয়ের নামে সাড়ে ৬ শতাংশ জমির দলিল সম্পাদিত হয়। এ সময়টিতে সাবরেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মো. জাহিদ হাসান।
বিভাগীয় প্রশাসনের ওই চিঠির সত্যতা স্বীকার করেন ময়মনসিংহের অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার (রাজস্ব) তাহমিনা আক্তার। এই প্রতিবেদককে তিনি বলেন, ‘২০১৬ সালের নিষেধাজ্ঞা-সংক্রান্ত চিঠির পরে আর কোনো চিঠি ইস্যু করা হয়নি। নির্দেশ এখনো বহাল রয়েছে।’
তবে স্থানীয় এলাকাবাসীর অভিযোগ, নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও নিয়মিত জমি রেজিস্ট্রেশন চলছে। ‘সাবরেজিস্ট্রারকে ম্যানেজ করলেই নিষিদ্ধ জমিও বিক্রি হয়ে যায়,’—এমন মন্তব্য করেছেন অনেকে। অভিযোগ রয়েছে, সাবরেজিস্ট্রার মো. জাহিদ হাসান মোটা অঙ্কের ঘুষ নিয়ে দালাল চক্র ও নির্দিষ্ট কিছু দলিল লেখকের মাধ্যমে এসব রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন করেন। দলিল প্রক্রিয়াগুলো যাতে প্রশাসনের নজরে না পড়ে, সে জন্য গ্রহণ করা হয় নিত্য নতুন কৌশল।
ছাত্রলীগের তকমা লাগিয়ে ফ্যাসিস্ট সরকারের আমলে সে চাকরি নেয়। ময়মনসিংহ সদরে উপজেলা সাবরেজিস্ট্রার বদলি করেন গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী শরীফ আহমেদ। শেল্টার দিতেন জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এড মোয়াজ্জেম হোসেন বাবুল, সিটি মেয়র ইকরামুল হক টিটু ও তার ভাই আমিনুল হক শামীম, সাবেক শহর ছাত্রলীগের সভাপতি আরিফ চক্রের সরাসরি নিয়ন্ত্রণে ছিলেন। রাজনৈতিক কর্মকান্ডে অর্থ প্রদানের অভিযোগ রয়েছে।
জাহিদ হাসানের নামে নগরীর নতুন বাজার অর্কিট প্লাজার ৬তলায় প্রায় দুই কোটি টাকার মূল্যেরর ৪হাজার স্কয়ার ফিটের ফ্লাটের ডেকোরেশনের কাজ চলমান। এছাড়াও নামে বেনামে রয়েছে ৫০০ কোটি টাকার মূল্যের সম্পদ। সরকারের শুল্ক ও রাজস্ব ফাঁকি দিয়ে গোপন রাখা হয়েছে সম্পদের বিবরণ।
ময়মনসিংহ সদর সাবরেজিস্ট্রারের এমন কাণ্ড কীর্তি নিয়ে নেটিজেনদের মাঝেও চলছে কড়া সমালোচনা। কেউ কেউ মন্তব্য করে লিখেছেন, ‘জুলাই বিপ্লবের পর তো ঘুষ-দুর্নীতি বন্ধ হওয়ার কথা ছিল! কিন্তু এখনো সাবরেজিস্ট্রি অফিসে টাকা না দিলে কোনো কাজ হয় না।’ সাবেক কাউন্সিলর বিপ্লব হোসেন অভিযোগ করে বলেন, ঘুষ ছাড়া দলিল করা সম্ভব নয়। ঘুষ না দিলে হয়রানির মুখে পড়তে হয়।’ এ বিষয়ে জেলা রেজিস্ট্রার, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও ভূমি মন্ত্রণালয়ের হস্তক্ষেপ কামনা করে ভুক্তভোগীরা অবিলম্বে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অপসারণ ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
সাবরেজিস্ট্রার জাহিদ হাসানের জাতীয় পরিচয়পত্র মোতাবেক- তিনি ময়মনসিংহ সদর উপজেলার বাঘেরকান্দা রহমতপুর গ্রামের স্থায়ী বাসিন্দা। ফলে এলাকার প্রভাবশালী মহলের সঙ্গেও তার নিবিড় যোগাযোগ রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে
সাবরেজিস্ট্রার জানান, নতুন অধিগ্রহণ এলাকার চিঠির প্রেক্ষিতে দলিল হচ্ছে। কিন্তু পূর্বের অধিগ্রহণ এলাকার দলিল বন্ধের বিষয়ে নতুন চিঠি পেয়েছেন এমন প্রশ্ন এড়িয়ে সরাসরি সাক্ষাৎ করতে বলেন। এসব বিষয়ে জেলা রেজিস্টার পথিক কুমার সাহা বলেন, সঠিক নিয়মে অফিস পরিচালিত হচ্ছে। অভিযোগের বিষয়ে খোঁজ খবর নেয়া হবে। অভিযোগ পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়া হবে।









