চট্টগ্রামে গতকাল সিরিজ নির্ধারণী তৃতীয় ও শেষ ম্যাচে নিউজিল্যান্ডকে ৫৫ রানে হারিয়েছে মেহেদী হাসান মিরাজের দল। এ জয়ে ২-১-এ সিরিজ নিশ্চিত করল স্বাগতিকরা।
বাংলাদেশের জয়ের কাণ্ডারি নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুস্তাফিজুর রহমান। শান্তর সেঞ্চুরিতে ৮ উইকেটে ২৬৫ রান তুলতে সমর্থ হয় স্বাগতিকরা। জবাবে স্বাগতিকদের দুর্দান্ত বোলিং আক্রমণের মুখে কিউইরা ২১০ রানে অলআউট হয়ে যায়। কৃতী পেস বোলার মুস্তাফিজুর রহমান ক্যারিয়ারে ষষ্ঠবারের মতো ৫ উইকেট নিয়ে জিতিয়েছেন বাংলাদেশকে।
সাগরিকায় টস জিতে বোলিং বেছে নেয় নিউজিল্যান্ড। কিউই পেসার উইলিয়াম ও’রুর্ক শুরুতে লণ্ডভণ্ড করে দেন বাংলাদেশের টপ অর্ডার। ইনিংসের দ্বিতীয় বলেই সাইফ হাসানকে সাজঘরে ফেরান তিনি। এরপর দলীয় ৯ রানে তানজিদ হাসানকে ও ৩২ রানে সৌম্য সরকার তার গতি বলের শিকার হন।
এরপর ঘুরে দাঁড়ানোর অবিশ্বাস্য গল্প। দ্রুত ৩ উইকেট হারানোর পর হাল ধরেন টেস্ট অধিনায়ক শান্ত ও টি-টোয়েন্টি অধিনায়ক লিটন। দুজন গড়লেন ১৭৮ বলে ১৬০ রানের জুটি। লিটন ৭৬ রানে বিদায় নিলেও শান্ত করেছেন ক্যারিয়ারের চতুর্থ সেঞ্চুরি। দুই বছর পর ওয়ানডেতে তিন অংক ছুঁয়েছেন তিনি। যদিও টেলএন্ড ভালো করতে না পারায় শেষ পর্যন্ত ২৬৫ রানে থেমে যায় দলের স্কোরটা।
আট বছরের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে চতুর্থ সেঞ্চুরির দেখা পেলেন শান্ত। ২০১৮ সালে আফগানিস্তানের বিপক্ষে আবুধাবিতে অভিষেক হওয়া শান্ত এখন পর্যন্ত ৬৪ ম্যাচ খেলেছেন। ফিফটি করেছেন ১২টি, সেঞ্চুরি ৪টি। ২০২৩ সালে চেমসফোর্ডে আয়ারল্যান্ডের বিপক্ষে প্রথম সেঞ্চুরি (১১৭) করেন তিনি। একই বছর লাহোরে আফগানিস্তানের বিপক্ষে দ্বিতীয় ও গত বছর মার্চে এই চট্টগ্রামে শ্রীলংকার বিপক্ষে তৃতীয় সেঞ্চুরি (১২২ রান) করেন শান্ত। সেই মাঠেই এবার দেখা পেলেন চতুর্থ সেঞ্চুরি। টেস্টে তার সেঞ্চুরি আটটি।
১১৯ বলে ৯ বাউন্ডারি ও ২ ছক্কায় ১০৫ রানের দারুণ ইনিংস খেলে স্পিনার জেইডেন লেনক্সের কাছে হার মানেন শান্ত।
তার বিদায়ের পর তাওহীদ হৃদয়কে নিয়ে ৩৫ রানের জুটি গড়েন অধিনায়ক মিরাজ। এরপর মাত্র ছয় বলের ব্যবধানে তিন উইকেট হারালে রানের চাকা শ্লথ হয়ে পড়ে বাংলাদেশের। মাত্র তিন বলের ব্যবধানে সাজঘরে ফিরেছেন মিরাজ ও শরীফুল ইসলাম। ৪৮তম ওভারের পঞ্চম বলে মিরাজকে ফেরান ডিন ফক্সক্রফট। পরের ওভারের প্রথম বলে শরীফুল ও চতুর্থ বলে তানভীর ইসলামকে ফেরান বেন লিস্টার।
শান্তর বিদায়ের সময় ৪৩ ওভারে ৫ উইকেটে ২২১ রানের সংগ্রহ ছিল বাংলাদেশের। ৫০ ওভার শেষে সংগ্রহ দাঁড়ায় ২৬৫/৮। অর্থাৎ, ৩ উইকেট হারিয়ে শেষ ৭ ওভারে তারা বোর্ডে যোগ করতে পেরেছে মাত্র ৪৪ রান। অথচ এ সময় অনায়াসেই ৬০-৭০ রান তোলা সম্ভব ছিল।
এরপর মুস্তাফিজ, রানা ও শরীফুলদের দুর্দান্ত প্রদর্শনীতে বোলিংয়ে কর্তৃত্ব করে বাংলাদেশ। ৯ ওভারে ৪৩ রান খরচ করে ৫ উইকেট নিয়েছেন ‘ফিজ’। প্রত্যাবর্তনের ম্যাচেই ৫ উইকেট শিকার করলেন তিনি। ২০১৯ বিশ্বকাপের পর প্রথমবার ৫ উইকেট নিলেন তিনি। ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ৫ উইকেট নিলেন ষষ্ঠবারের মতো। এর মধ্য দিয়ে তিনি স্পর্শ করলেন পাকিস্তান গ্রেট ওয়াসিম আকরাম ও কিউই গ্রেট ট্রেন্ট বোল্টকে। বামহাতি পেসারদের মধ্যে ফিজের ওপরে কেবল অস্ট্রেলিয়ার মিচেল স্টার্ক। অজি গ্রেট নয়বার নিয়েছেন ৫ উইকেট।
এছাড়া দুর্দান্ত বোলিং করেছেন নাহিদ রানা (২/৩৭), মিরাজ (২/৩৬) ও শরীফুল (১/১৯)। বামহাতি পেসার শরীফুল ৭ ওভারে ১৯ রান খরচ করে সবচেয়ে মিতব্যয়ী ছিলেন।
দলগত নৈপুণ্যে ওয়ানডে ক্রিকেটে নিউজিল্যান্ডকে তৃতীয়বারের মতো সিরিজে হারানোর কৃতিত্ব দেখাল বাংলাদেশ। ১২ বারের মোকাবেলায় এ নিয়ে তৃতীয়বারের মতো কিউইদের ওয়ানডে সিরিজে হারাল টাইগাররা।
২০১৬ সাল থেকে শুরু করে টানা পাঁচটি সিরিজে হারের পর অবশেষে জিতল বাংলাদেশ। আগের পাঁচ সিরিজের মধ্যে চারটিই ছিল নিউজিল্যান্ডের মাঠে। এর আগে ২০২৩ সালে বাংলাদেশ সফরে এসে ৩-০-তে সিরিজ জয় করে কিউইরা। এবার অবশ্য পূর্ণশক্তির দল পাঠায়নি ওশেনিয়ার নিউজিল্যান্ড বোর্ড। তারা এসেছে খর্বশক্তির দল নিয়ে। এ দলটিও প্রথম ম্যাচে বাংলাদেশকে হারিয়ে দেয়। যদিও নাহিদ রানা, নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুস্তাফিজুর রহমানের বীরত্বে টানা দুই ম্যাচ জিতে নিল বাংলাদেশ।
এর আগে ২০১০ সালে নিউজিল্যান্ডের মাঠে ও ২০১৩ সালে ঘরের মাঠে ওয়ানডে সিরিজে কিউইদের হারায় বাংলাদেশ। সব মিলিয়ে বাংলাদেশের মাঠে ছয়টি ওয়ানডে সিরিজের মধ্যে উভয় দল জিতেছে তিনটি করে। নিউজিল্যান্ড নিজেদের মাঠে সবগুলো সিরিজ জিতেছে।
জয় শেষে বাংলাদেশ দলনায়ক মিরাজ বলেছেন, ‘দারুণ এক ম্যাচ ছিল এটা। সহজ ছিল না। ছেলেরা সবাই ভালো বল করেছে, বিশেষ করে মুস্তাফিজ।’ লিটন ও শান্তর জুটি নিয়ে তিনি বলেন, ‘তিন উইকেট পতনের পর শান্ত ও লিটন দারুণ এক জুটি গড়ে। তারা দায়িত্বশীল ব্যাটিং করে। দলের সিনিয়র হিসেবে তাদের দায়িত্ব নেয়া উচিত ছিল এবং তারা সেটি দারুণভাবে করেছে।’
সংক্ষিপ্ত স্কোর
বাংলাদেশ: ৫০ ওভারে ২৬৫/৮ (শান্ত ১০৫, লিটন ৭৬; ও’রুর্ক ৩/৩২)। নিউজিল্যান্ড: ৪৪.৫ ওভারে ২১০/১০ (ফক্সক্রফট ৭৫, নিক কেলি ৫৯; মুস্তাফিজ ৫/৪৩)। ফল: বাংলাদেশ ৫৫ রানে জয়ী। প্লেয়ার অব দ্য ম্যাচ: নাজমুল হোসেন শান্ত। প্লেয়ার অব দ্য সিরিজ: নাহিদ রানা।









