‘করব কাজ, গড়ব দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ’—এই স্লোগানে মুখরিত হয়ে উঠেছিল চাঁদপুর শহরের মুনিরা ভবন। এসএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া চাঁদপুর সদর ও হাইমচর উপজেলার ৫৫৩ মেধাবী শিক্ষার্থীকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়েছে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক, শিক্ষক, সরকারি কর্মকর্তা ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠানটি পরিণত হয় এক মিলনমেলায়।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিকের উদ্যোগে জেলা শিক্ষা অফিসের আয়োজনে এ সংবর্ধনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন চাঁদপুরের জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোহাম্মদ রুহুল্লাহ। চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম এন জামিউল হিকমার সাবলীল উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানের কার্যক্রম পরিচালিত হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে বলেন, ‘সবার আগে বাংলাদেশ। করব কাজ, গড়ব দেশ—সবার আগে বাংলাদেশ।’ তিনি শিক্ষার্থীদের মনোযোগ দিয়ে লেখাপড়া করার পাশাপাশি মাদক, সন্ত্রাস ও অপরাধের বিরুদ্ধে সামাজিকভাবে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।
তিনি বলেন, চাঁদপুরকে শিক্ষাবান্ধব ও আধুনিক কর্মসংস্থানমুখী জেলা হিসেবে গড়ে তুলতে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। শিক্ষার্থীরা যেন উচ্চশিক্ষার জন্য অন্যত্র যেতে বাধ্য না হয়, সে লক্ষ্যে স্থানীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষার মান উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক বলেন, চাঁদপুরে উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও সম্প্রসারিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার জন্য ৬৫ একর জমি অধিগ্রহণের কাজ চলছে বলেও তিনি জানান। একই সঙ্গে চাঁদপুরে অর্থনৈতিক অঞ্চল ও ইপিজেডসহ বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগের কথা তুলে ধরে তিনি বলেন, এসব প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে শিক্ষিত তরুণদের জন্য স্থানীয়ভাবে কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
মাদক প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘মাদক চাঁদপুরে থাকতে দেওয়া হবে না।’ মাদক, চাঁদাবাজি, সন্ত্রাস ও ভূমিদখলের বিরুদ্ধে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, অপরাধীদের প্রচলিত আইনের আওতায় বিচার করা হবে; তবে কোনোভাবেই আইন নিজের হাতে তুলে নেওয়া বা ‘মব’ তৈরি করা যাবে না।
মেধাবী শিক্ষার্থীদের আর্থিক সহায়তার প্রসঙ্গে সংসদ সদস্য বলেন, অর্থের অভাবে যাতে কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ না হয়, সে বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সমাজকল্যাণ মন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলে ৭৮৬ জন শিক্ষার্থীর তালিকা দেওয়া হয়েছে এবং প্রথম পর্যায়ে ৫০ জন শিক্ষার্থীকে ১০ হাজার টাকা করে সহায়তার চেক দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে তিনি জানান। আর্থিক সমস্যায় থাকা শিক্ষার্থীদের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও জেলা প্রশাসকের কাছে আবেদন করার পরামর্শও দেন তিনি।
পরিবেশ রক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শিক্ষার্থীদের আগামী এক সপ্তাহের মধ্যে অন্তত দুটি করে গাছ লাগানোর আহ্বান জানান শেখ ফরিদ আহমেদ মানিক। গাছ লাগানোর ছবি সংরক্ষণ করে রাখার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ভবিষ্যতে শিক্ষার্থীরা বড় হয়ে দেশের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে গেলে এসব ছবি তাদের অতীতের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে।
তিনি আরও বলেন, ডেঙ্গু প্রতিরোধে প্রত্যেককে নিজ নিজ বাড়ি ও আশপাশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে। পাশাপাশি চাঁদপুরে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যার মাধ্যমে বর্জ্য পুনর্ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হবে।
অনুষ্ঠানে কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক মো. আহসান পারভেজ, চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান, পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান, জেলা পরিষদের প্রশাসক অ্যাডভোকেট সলিম উল্লাহ সেলিম, প্রধান শিক্ষক আব্দুল মান্নান, প্রধান শিক্ষক মোর্শেদা ইয়াসমিন, অধ্যক্ষ এটিএম মোস্তফা, অধ্যক্ষ মো. হারুন অর রশিদসহ বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা, শিক্ষক ও আমন্ত্রিত অতিথিরা বক্তব্য দেন।
অনুষ্ঠানে অভিভাবকদের মধ্যে বক্তব্য দেন রাশেদুল ইসলাম, রতন কুমার বাইন ও জোসনা আক্তার মমতাজ। মেধাবী শিক্ষার্থীদের অনুভূতি ব্যক্ত করেন মেহজাবিন ইসলাম, জেবা ফারিয়া, তাজবীর বিন হান্নান, মারিয়া মাহজাবিন খান, ফাহিমা আপ্পান খান ও জান্নাতুল মাইশা।
পবিত্র কোরআন তেলাওয়াত ও গীতা পাঠের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠান শুরু হয়। কোরআন তেলাওয়াত করেন কৃতি শিক্ষার্থী মো. মিরাজুল ইসলাম মাহিন এবং গীতা পাঠ করেন অপরাজিতা ধর মুগ্ধ। পরিবেশন করা হয় জাতীয় সংগীত।
অনুষ্ঠানে ৫৫৩ জন জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকদের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। শিক্ষার্থীদের সাফল্য উদযাপন, অভিভাবকদের আবেগ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে দেশ গঠনে উদ্বুদ্ধ করার বার্তা—সব মিলিয়ে আয়োজনটি উপস্থিত সবার মধ্যে ব্যাপক সাড়া ফেলে।
চাঁদপুরে এত বড় পরিসরে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের একসঙ্গে সংবর্ধনা দেওয়ার আয়োজন আগে দেখা যায়নি। উপস্থিত অনেকেই অনুষ্ঠানটিকে জেলার শিক্ষা অঙ্গনের একটি স্মরণীয় আয়োজন হিসেবে উল্লেখ করেন।








