কক্সবাজারের হোটেল-মোটেল জোনের কলাতলী মোড়ে উচ্চ আদালতের স্থিতাবস্থা (স্ট্যাটাস-কো) আদেশ থাকা সরকারের ১ নং খাস খতিয়ানভুক্ত বাতিলকৃত সরকারি প্লটে অবৈধ স্থাপনা সরাতে একদিন সময় বেঁধে দেয়ার ২৪ ঘন্টা না পেরোতেই, নিজ উদ্যোগে অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নিয়েছে খোদ দখলদাররা।
সম্প্রতি কলাতলীর বৈখাশী রেস্তোরাঁ সংলগ্ন একটি শতকোটি টাকার সরকারি জমি দখল করে গড়ে উঠা অবৈধ স্থাপনা নিয়ে কক্সবাজারে সৃষ্টি হয় সমালোচনার।
অভিযোগ উঠে, বৈশাখী রেস্তোরাঁর মালিক কামরুল নামে এক ব্যক্তি রাজনৈতিক নেতা ও প্রশাসনের সাথে সমন্বয় করে সরকারের শতকোটি টাকার জায়গায় টিনের উঁচু প্রাচীরের ভিতরে রাতারাতি গড়ে তুলেছে ২২টি দোকান। যার নাম রাখা হয়েছে ‘কামরুল মার্কেট।’ এসব দোকান থেকে সেলামী বাবদ দোকান প্রতি ২০-২৫ লক্ষ টাকা করে হাতিয়ে নেয়া হয়। আগামী সপ্তাহের মধ্যেই এসব দোকান বুজিয়ে দেয়ার জন্য দ্রুত নির্মাণ কাজ করা হয়।
এসবের সত্যতা হিসেবে ক্ষমতাসীন দলের সাবেক এক ছাত্রদল নেতা সাংবাদিককে হুমকি দেয়ার অডিও তথ্য পাওয়া যায়।
এসব ঘটনা গত ২৯ সেপ্টেম্বর দৈনিক চিত্র’সহ বিভিন্ন স্থানীয় গণমাধ্যমে আসার পর নড়েচড়ে বসে জেলা প্রশাসন। তারই পেক্ষাপটে গত বুধবার (৩০ সেপ্টেম্বর) অবৈধ দখলদারদের আইনি নোটিশ দেন জেলা প্রশাসন।
নোটিশে বলা হয়েছিলো, সরকারি জমিতে স্থাপনা নির্মাণ করা আইনগতভাবে অপরাধ। আগামী চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে নিজ উদ্যোগে স্থাপনা না সরালে উচ্ছেদসহ অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এই নোটিশের ২৪ ঘন্টা না পেরোতেই দখলে নাম আসা কামরুলের নেতৃত্বেই এসব স্থাপনা সরিয়ে নেয়া হয় বলে জানা যায়।
সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, সকাল থেকে শ্রমিক নিয়োগ করে নির্মাণকৃত স্থাপনা অপসারণ করা হচ্ছে। যদিও এসব শ্রমিকদের কে বা কারা নিয়োগ করেছে, এই বিষয়ে জানতে চাইলে ক্যামেরার সামনে মুখ খুলতে রাজি হননি তারা।
বিকাল ৩ টার সময় স্থানীয় গণমাধ্যমের এক সাংবাদিক স্থাপনা অপসারণ সরাসরি সম্প্রচার করতে গেলে তাকে বাঁধা দেয়ার অভিযোগ উঠে কামরুলের বিরুদ্ধে।
তথ্যসূত্রে জানা যায়, কামরুলের বৈশাখী রেস্তোরাঁও সরকারের বাতিল প্লটের মধ্যেই গড়ে তুলেছে। শুধু কলাতলী নয়, সুগন্ধাতেও নামে- বেনামে সরকারি জমি দখল করে নিরবে ব্যবসা পরিচালনা করে যাচ্ছে কামরুল। এরআগে ২০২৫ সালের ১৩ ফেব্রুয়ারী কক্সবাজার সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) শারমিন সুলতানার নেতৃত্বে ভ্রাম্যমান আদালত অভিযান পরিচালনা করে রেস্তোরাঁটি উচ্ছেদ করেন।
সরকারি বাতিল প্লটে গড়ে উঠা প্রাসাদ প্যারাডাইসের মালিক দাবীদার ইউসুফ আব্দুল্লার বিরুদ্ধেও পাওয়া যায় নানা অভিযোগ। দখলের পাশাপাশি দখলকৃত জমির নিরাপত্তা প্রহরী মোঃ হাছিমকে ১৬ বছরের বেতন বকেয়া রাখার অভিযোগও উঠে ইউসুফ আব্দুল্লার বিরুদ্ধে।
জমিটির নিরাপত্তা প্রহরী মোঃ হাছিম বলেন, ‘আমি ইউসুফ আব্দুল্লার কাছে ২৩ বছর যাবত নিরাপত্তা প্রহরীর কাজ করে যাচ্ছি। এই জমিটিও দীর্ঘদিন ধরে আমি দেখাশোনা করে যাচ্ছি। তবে দুঃখের বিষয় আমি তার কাছে বিগত ২৩ বছর ধরে চাকরি করলেও মাত্র ৭ বছর তিনি আমাকে বেতন পরিশোধ করেন। বাকি ষোলো বছরের বেতন এখনও বকেয়া।’
সাদেক আহমেদ নামে এক স্থানীয় বলেন, ‘রাতারতি সরকারের ৪.৫০ একর জমি দখলের পায়তারা চারটিখানি কথা নয়। এই যে সরকার এসব অবৈধ স্থাপনা সরিয়ে নেয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন। দখলদাররাও তা সরিয়ে নিচ্ছে কিন্তু আবার কিছুদিন পর দেখা যাবে একই সিন্ডিকেট নতুন করে আবারও এই জমি ভ্রাম্যমাণ দোকান বসিয়ে দখলের চেষ্টা চালাবে। প্রশাসনের উচিৎ ছিলো বুলডোজার দিয়ে এসব স্থাপনা একেবারে গুড়িয়ে দেয়া। যাতে দ্বিতীয় বার এসব অবৈধ স্থাপনা নতুন ভাবে আর গড়ে তুলতে না পারে।’
অভিক রায় নামে এক যুবক বলেন, ‘কলাতলী- সুগন্ধার এসব সরকারি বাতিল প্লট বৈধভাবে ইজারা বা অনুমোদন দেওয়া হলে সরকার ভাড়া, ইজারা মূল্য, ফি বা অন্যান্য রাজস্ব পেতে পারত। অনুমতি ছাড়া ব্যবসার ফলে সরকার বারবার সেই আয় হারাচ্ছে।’
এসব ঘটনার মূল অভিযুক্ত বৈশাখী রেস্তোরাঁর মালিক কামরুলের কাছ থেকে বক্তব্য নিতে চাইলে দ্রুত সিএনজি অটোরিকশা যোগে স্থান ত্যাগ করেন তিনি।
এবিষয়ে কক্সবাজার সদর উপজেলা ভূমি সহকারী কমিশনার (ভূমি) মশিয়ুর রহমান বলেন, ‘নোটিশ দেয়ার পর তারা নিজ উদ্যোগে এসব স্থাপনা সরিয়ে নিয়েছে। আবার যদি এসব জায়গা দখলের চেষ্টা করা হয় তবে তা কঠোর হস্তে দমন করা হবে। ঐ জায়গায় নতুন করে কিছু করার সুযোগ নাই। কেউ যদি আবারও দখল করতে চায় তখন আবারও আইনি ব্যবস্থা নেয়া হবে।’









