ভরা মৌসুমেও নোয়াখালীর হাতিয়ার মেঘনায় মিলছে না কাঙ্ক্ষিত ইলিশ। দিন-রাত জাল ফেলেও অধিকাংশ জেলে ফিরছেন খালি হাতে। লোকসানের মুখে পড়েছেন জেলে, আড়তদার, বরফকল মালিক, পরিবহন শ্রমিক ও মাছ ব্যবসায়ীরা। এতে ইলিশনির্ভর হাতিয়ার লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
সরেজমিনে চেয়ারম্যানঘাট, বাংলাবাজার, বৌবাজার, কাজীর বাজার, সূর্যমুখী, রহমত বাজার, কাদিরা সুইজ, বুড়িরদোনা, জঙ্গলিয়া, রাতারখাল, এম আলী সুইজ, নিঝুমদ্বীপ, কাটাখালী, চরচেঙ্গা, তমরদ্দি, সুখচর ও নলচিরাসহ বিভিন্ন মাছঘাট ঘুরে দেখা গেছে, ইলিশের সংকটে অধিকাংশ ঘাটই প্রায় ফাঁকা। নেই মাছভর্তি ট্রলারের ভিড়, আড়তের কর্মচাঞ্চল্য কিংবা বরফকলের ব্যস্ততা। থমকে গেছে বেচাকেনা।
প্রতি বছর এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত ইলিশের ভরা মৌসুম। এ সময়ের আয়ের ওপরই নির্ভর করেন অধিকাংশ জেলে। কিন্তু এবার মৌসুমের বড় অংশ পার হলেও কাঙ্ক্ষিত ইলিশ মিলছে না। যে অল্প কিছু মাছ ধরা পড়ছে, তা বিক্রি করে জ্বালানি, বরফ, খাদ্য ও শ্রমিকের মজুরির খরচও উঠছে না।
হাতিয়া উপজেলার ১১টি ইউনিয়ন ও একটি পৌরসভায় প্রায় সাত লাখ মানুষের বসবাস। সরকারি হিসাবে নিবন্ধিত জেলের সংখ্যা ২৫ হাজার ৯৯৫। তবে মাছ ধরা, আড়ত, বরফকল, পরিবহন ও মাছ ব্যবসার সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত মানুষের সংখ্যা লক্ষাধিক।
জেলেরা জানান, মৌসুম শুরুর আগে অনেকেই এনজিও, ব্যাংক ও মহাজনের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে জাল মেরামত, ট্রলার সংস্কার এবং জ্বালানির ব্যবস্থা করেছেন। কিন্তু মাছ না পাওয়ায় ঋণ শোধ তো দূরের কথা, প্রতিদিনই বাড়ছে লোকসান। অনেক পরিবারে নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ চালানোও কঠিন হয়ে পড়েছে।
চেয়ারম্যানঘাটের জেলে আব্দুল করিম বলেন, ভোর থেকে রাত পর্যন্ত নদীতে থাকি। কিন্তু জাল তুললেই হতাশ হতে হয়। আগে একবার জাল ফেললেই ভালো ইলিশ পাওয়া যেত। এখন কয়েকবার ফেলেও তেমন মাছ মিলছে না। সংসার চালানোই দায় হয়ে গেছে।
সূর্যমুখী এলাকার ট্রলার মাঝি মো. সেলিম বলেন, প্রতিদিন হাজার হাজার টাকা খরচ করে নদীতে নামি। মাছ না পেলে সেই টাকা আর ফিরে আসে না। এভাবে চলতে থাকলে ট্রলার বন্ধ করে দিতে হবে।
ইলিশের সংকটে স্থবির হয়ে পড়েছে স্থানীয় আড়ত ও বাজারও। ব্যবসায়ীরা কর্মচারীদের বেতন দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। কাজ না থাকায় ঘাটশ্রমিকদের অনেকেই মানবেতর জীবন কাটাচ্ছেন।
চেয়ারম্যানঘাটের মাছ ব্যবসায়ী মাসুম বলেন, ভরা মৌসুমে ঘাটে দাঁড়ানোর জায়গা থাকে না। এবার মাছ নেই, ক্রেতাও নেই। প্রতিদিনই লোকসান বাড়ছে।
হাতিয়া উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা ফয়জুর রহমান বলেন, জাটকা নিধন, মা ইলিশ শিকার, নদীতে ডুবোচর সৃষ্টি, জলবায়ু পরিবর্তন, স্রোত ও লবণাক্ততার তারতম্য এবং শিল্পবর্জ্যের কারণে ইলিশের বিচরণ ব্যাহত হতে পারে। তবে মৌসুম এখনো শেষ হয়নি। অনুকূল পরিবেশ তৈরি হলে আগামী দিনগুলোতে মেঘনায় ইলিশের উপস্থিতি বাড়তে পারে।









