বুধবার | ২৯ জুলাই, ২০২৬ | ১৪ শ্রাবণ, ১৪৩৩

কুষ্টিয়ায় এক শরীরে দুই প্রাণ, দারিদ্র্যে থমকে আছে চিকিৎসা

স্টাফ রিপোর্টার

জন্মের পর থেকেই বুক থেকে পেট পর্যন্ত অবিচ্ছেদ্যভাবে যুক্ত জয়নব ও উম্মে কুলসুম। একজন কাঁদলে অন্যজনও কেঁদে ওঠে, একজন সামান্য নড়াচড়া করলেই ব্যথায় কুঁকড়ে যায় আরেকজন। আধুনিক চিকিৎসা বলছে, অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের আলাদা করে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হতে পারে। কিন্তু সেই সম্ভাবনার পথে এখন সবচেয়ে বড় বাধা দারিদ্র্য।

কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার প্রাগপুর ইউনিয়নের বিলগাথুয়া মধ্যপাড়া গ্রামের নাহিদ হাসান (২৬) ও সানজিদা ইয়াছমিন মুক্তা (২২) দম্পতির ঘরে গত ৪ মে ঢাকার বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএসএমএমইউ) হাসপাতালে সিজারিয়ান অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে জন্ম নেয় বিরল এই জোড়া লাগা যমজ কন্যাশিশু।

সন্তান জন্মের আনন্দ বেশিক্ষণ স্থায়ী হয়নি। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, শিশু দুটিকে আলাদা করতে একাধিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা, নিয়মিত চিকিৎসা এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের নিবিড় তত্ত্বাবধান প্রয়োজন। জন্মের তিন মাস পূর্ণ হলে আবার ঢাকায় নিয়ে আসতে বলা হলেও চরম আর্থিক সংকটের কারণে নির্ধারিত সময়ে তাদের হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

পরিবার জানায়, প্রায় চার বছর আগে নাহিদ ও মুক্তার বিয়ে হয়। দাম্পত্য জীবনের দুই বছর পর তাদের ঘরে জন্ম নেয় ছেলে নোমান। দ্বিতীয়বার গর্ভধারণের সময় আল্ট্রাসনোগ্রামে ধরা পড়ে, গর্ভের যমজ সন্তান দুটি একে অপরের সঙ্গে যুক্ত। স্থানীয়ভাবে সিজারিয়ান সম্ভব না হওয়ায় প্রথমে কুষ্টিয়ার একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরে ঝুঁকিপূর্ণ বিবেচনায় বিএসএমএমইউতে স্থানান্তর করা হলে সেখানেই জন্ম হয় দুই শিশুর।

একসময় রাজধানীর একটি পোশাক কারখানায় কাজ করতেন শিশুদের বাবা নাহিদ হাসান। বর্তমানে তিনি স্থানীয় একটি দোকানে কর্মচারী। মাসে মাত্র ৯ থেকে ১০ হাজার টাকা আয়ে পাঁচ সদস্যের সংসার চালাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে। এর মধ্যেই শিশুদের দুধ, ওষুধ ও চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে ঋণের বোঝা বেড়েছে।

কান্নাজড়িত কণ্ঠে নাহিদ বলেন, ‘চিকিৎসকেরা বলেছেন, আমার মেয়েদের আলাদা করা সম্ভব। কিন্তু সেই চিকিৎসার খরচ বহন করার সামর্থ্য নেই। এখন দুধ কেনার টাকাই জোগাড় করতে কষ্ট হচ্ছে। নিয়মিত ঢাকায় যেতে হবে, নানা পরীক্ষা করাতে হবে, কিন্তু যাতায়াতের খরচও জোগাড় করতে পারছি না।’

শিশুদের দাদি নার্গিছ পারভীন বলেন, ‘দুই শিশুর জন্য প্রতিদিন দেড় থেকে দুই প্যাকেট তরল দুধ লাগে। সেই দুধ কেনার টাকাও আমাদের হাতে থাকে না। সিজারিয়ানের জন্য অনেক ঋণ করেছি। সরকার, সমাজের বিত্তবান মানুষ ও মানবিক সংগঠনগুলো এগিয়ে এলে হয়তো আমার নাতনিরা নতুন জীবন পাবে।’

স্থানীয় চিকিৎসকদের মতে, জোড়া লাগা যমজ শিশু জন্ম নেওয়া অত্যন্ত বিরল ঘটনা। তবে আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থায় সফল অস্ত্রোপচারের মাধ্যমে তাদের আলাদা করার সম্ভাবনা রয়েছে। এজন্য দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতি, উন্নত চিকিৎসা সুবিধা এবং অভিজ্ঞ বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দলের তত্ত্বাবধান প্রয়োজন।

দৌলতপুর উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম বলেন, পরিবারটি সমাজসেবা কার্যালয়ে আবেদন করলে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের অনুকূলে সমাজসেবা অধিদপ্তরের রোগী কল্যাণ সমিতির মাধ্যমে সহায়তা দেওয়া সম্ভব হবে। পাশাপাশি উপজেলা সমাজকল্যাণ পরিষদের মাধ্যমেও আর্থিক ও অন্যান্য সহযোগিতার চেষ্টা করা হবে।

দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করা এই পরিবারের এখন একটাই স্বপ্ন- জয়নব ও উম্মে কুলসুম একদিন আলাদা দুটি স্বাভাবিক জীবন পাবে। কিন্তু অর্থাভাবে সেই স্বপ্ন আজ অনিশ্চয়তার মুখে। সময়মতো চিকিৎসা নিশ্চিত করা না গেলে ক্ষীণ হয়ে যেতে পারে তাদের স্বাভাবিক জীবনে ফেরার সম্ভাবনা। তাই সরকারি সহায়তার পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ব্যক্তি, মানবিক সংগঠন ও স্বেচ্ছাসেবীদের সহযোগিতাই হতে পারে দুই শিশুর নতুন জীবনের সবচেয়ে বড় আশার আলো।

 

 

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক

মোঃ ইউনুছ আলী

স্বত্ব © ২০২৫ মাতৃভূমির দৈনিক চিত্র

অনুসরণ করুন

যোগাযোগ : ৭১, পুস্প প্লাজা (চতুর্থ তলা), কারওয়ান বাজার, ঢাকা – ১২১৫।
ফোন : +৮৮ ০১৯২৯-৩৬৫২২৯। মেইল : dailychitro123@gmail.com

Design & Developed by : Rose IT BD