আগামী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে বেশ কিছু চমক রাখতে চায় বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকার। মূলত দুর্নীতি কমিয়ে অর্থনীতিতে আস্থা ফেরানো মূল লক্ষ্য আসছে বাজেটে। কর আদায়ে আসবে একাধিক নতুন কৌশল। সব নাগরিককে আনা হবে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের আওতায়। প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর জানালেন, ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতি হওয়ার চেষ্টা চলছে জোরেশোরে।
চলতি বছরের গত ফেব্রুয়ারিতে দায়িত্ব নেওয়ার পর নতুন বাজেট প্রণয়নে তিন মাস সময় পেয়েছে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সরকার। এর আগে থেকেই অর্থনীতিতে বিশাল সব সংকট। লক্ষ্যের ধারে কাছেও নেই রাজস্ব আদায়। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের কারণে জ্বালানি ব্যয় আর বিদ্যুতে ভর্তুকি নিয়ে বড় মাথাব্যথা। এমনকি কমছে না নিত্যপণ্যের দাম। এ অবস্থায় নতুন বাজেট আকারে ছোট হবে, নানা মহলে এমন আলোচনা ছিল, কিন্তু হচ্ছে তার উল্টো।
আগের চেয়ে ১৪ শতাংশ বাড়িয়ে সংসদে ৯ লাখ কোটি টাকার বাজেট পেশ করতে পারে নতুন সরকার। যার সাড়ে ৬ লাখ কোটি আদায় করতে হবে রাজস্ব বিভাগকে। জিডিপি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ৬ দশমিক ৫ শতাংশ, মূল্যস্ফীতি ৭ শতাংশে নামিয়ে আনা হবে। অর্থের সংকট থাকলেও উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য বরাদ্দ প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। বাজেটের ৬৭ ভাগ ব্যয় হতে পারে পরিচালন খাতে।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা বলেন, প্রথম কাজ হচ্ছে অর্থনীতির চাকা সচল রাখা। একইসঙ্গে যাতে দারিদ্র্য না বাড়ে সেজন্য সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থা করা। তারপর অর্থনীতির গতি বৃদ্ধি করা। আমরা অতীতে বিএনপি সরকারের সময় দেখেছি, ২ শতাংশীয় পয়েন্ট আকারে প্রবৃদ্ধি হয়েছে। যেটা অন্য সরকারের সময় হয়নি। সেজন্যই আমরা বলছি, ২০৩৪ সালের মধ্যে ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি সম্ভব।
নতুন রাজস্ব লক্ষ্যে প্রভাব ফেলছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) শর্তে। সেই ধারাবাহিকতায় শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে কর অব্যাহতি আর প্রণোদনা। সারচার্জের বদলে আরোপ হতে পারে সম্পদ কর। আয়কর রিটার্ন যাচাই হবে বাড়ির মালিকদের। ভ্যাটের আওতায় আসবে এসএমই খাত। অনেক লেনদেনে বাধ্যতামূলক হবে ব্যাংক অ্যাকাউন্টের ব্যবহার।
প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনা উপদেষ্টা আরও বলেন, ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’ ও ‘ওয়ান ডিজিটাল আউটলেট’ চালুর দিকে এগোচ্ছি আমরা। এ লক্ষ্যেই নেওয়া হচ্ছে নানা পরিকল্পনা। প্রথম ধাপে দেশের প্রতিটি মানুষের ব্যাংক হিসাব নিশ্চিত করা হবে। এরপর সবাই কিউআর কোডের মাধ্যমে লেনদেন করবে। এতে কর ফাঁকি, কর পরিহার বা জালিয়াতির সুযোগ অনেকটাই কমে যাবে।
নতুন বাজেটে গুরুত্ব পাবে নির্বাচনের প্রতিশ্রুতি। ইশতেহারে আর্থিক-সামাজিক চুক্তির কথা বলেছিল বিএনপি, তারমানে জনগণ কর দেবে আর সরকার দেবে সেবা। সেই লক্ষ্যেই কৃষক কার্ড, ফ্যামিলি কার্ড কিংবা হেলথ কার্ড নিয়ে তোড়জোড় বেশি। এসব বাস্তবায়নে দরকার বাড়তি প্রায় ১ লাখ কোটি টাকা। তাহলে কীভাবে সামলাবে সরকার?
সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকার যেভাবে ঋণ করার উদ্যোগ নিচ্ছে, তাতে করে বেসরকারি খাতের জন্য ব্যাংক ব্যবস্থায় পর্যাপ্ত ঋণ থাকার সুযোগ কম। এবং সেখানে একটা ক্রাউডিং আউট ইফেক্ট হবে—ইতিমধ্যে সেটার একটা চাপ রয়েছে। সেই জায়গায় করে বিদেশ থেকে বাড়তি ফান্ড ফ্লো যদি এই ব্যাংকিং ব্যবস্থায় বা পুঁজিবাজারকেন্দ্রিক ব্যবস্থায় যুক্ত না করা যায়, তাহলে নতুন করে বিনিয়োগ বৃদ্ধি বা কর্মসংস্থান—সেই জায়গাটিও কিন্তু কষ্ট হবে।”
জাতীয় সংসদে নতুন বাজেট ঘোষণা হতে পারে আগামী ১১ জুন। অর্থনীতির এত সংকটের মাঝে বাজেট দিয়ে প্রথম বলেই ছক্কা হাঁকানোর সুযোগ নতুন সরকারের সামনে। রাজনৈতিক দল হিসেবে নানা প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের চাপ নিঃসন্দেহে থাকবে সরকারের, সেজন্য সবার আগে বাজেটের অগ্রাধিকার ঠিক করতে হবে।









