• প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল ছিল ২০১৫ থেকে ২০১৮ সাল
• জেননেক্সটের সঙ্গে বিডিসিসিএলের অসম চুক্তি
• রাজস্বের ৭৬ শতাংশ জেননেক্সটের, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বিডিসিসিএলের ভাগ ২৪
• ঋণের বোঝা ও কেনাকাটায় ৩০০ কোটি টাকার ‘পাইরেটেড’ জালিয়াতি
• রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অচল শতকোটি টাকার অবকাঠামো
• দরপত্র ছাড়াই ১৮ মিলিয়ন ডলারের ওরাকল চুক্তি
বিশ্বের সপ্তম বৃহত্তম ডাটা সেন্টার- ডাউনটাইম থাকবে শূন্যের কাছাকাছি। সরকারি তথ্য নিরাপদে সংরক্ষণের পাশাপাশি ক্লাউড সেবা বিক্রি করে আয় করবে রাষ্ট্র। এমন উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য সামনে রেখে চীনের ঋণ ও সরকারি অর্থে গড়ে তোলা হয়েছিল গাজীপুরের কালিয়াকৈরে দেশের জাতীয় ডাটা সেন্টার। প্রকল্পটির ব্যয় ১ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। এর মধ্যে চীনের ঋণ ১ হাজার ২০০ কোটি, আর সরকারের নিজস্ব অর্থ ৪১৬ কোটি টাকা।
কিন্তু প্রকল্পের নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যাওয়ার পরও এর অবকাঠামো, সফটওয়্যার, রক্ষণাবেক্ষণ ও বাণিজ্যিক ব্যবহার নিয়ে একের পর এক প্রশ্ন উঠেছে। যে ক্লাউড ব্যবস্থায় সরকারি তথ্য সংরক্ষণ এবং সেবা বিক্রি করে আয় করার কথা ছিল, সেই ব্যবস্থার একাংশ অচল হয়ে পড়েছে। অন্যদিকে, নিতে হয়েছে বিদেশি প্রতিষ্ঠানের ক্লাউড সেবা, আর দেশের নিজস্ব ডাটা সেন্টারের মূল্যবান জায়গা ও অবকাঠামো ব্যবহারের শর্ত নিয়েও প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ কম্পিউটার কাউন্সিলের (বিসিসি) আওতায় বাস্তবায়িত প্রকল্পটির ভেন্ডর ছিল চীনা প্রতিষ্ঠান জেডটিই হোল্ডিংস। প্রকল্পের মূল বাস্তবায়নকাল ছিল ১ জুলাই ২০১৫ থেকে ৩০ জুন ২০১৮। পরে মেয়াদ আরও দুই বছর বাড়ে এবং ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৬১৬ কোটি টাকা। প্রকল্পের সফটওয়্যার কেনাকাটা, চূড়ান্ত গ্রহণ সনদ, রক্ষণাবেক্ষণ এবং ক্লাউডের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্নের পাশাপাশি সামনে এসেছে বিদেশি ক্লাউডে সরকারি ডেটা স্থানান্তর ও দেশীয় অবকাঠামো ব্যবহার করে বাণিজ্যিক সেবা পরিচালনার বিষয়টি।
তথ্য বলছে, ২০১৯ সালের ৩০ ডিসেম্বর ডাটা সেন্টার পরিচালনার জন্য বাংলাদেশ ডাটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড (বিডিসিসিএল) গঠনের প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় অনুমোদিত হয়। কোম্পানিটি নিবন্ধিত হয় ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২০। এরপর জাতীয় ডাটা সেন্টারের বাণিজ্যিক পরিচালনা, সরকারি তথ্য সংরক্ষণ ও ক্লাউড সেবা বিক্রির দায়িত্ব পায় প্রতিষ্ঠানটি। তবে প্রকল্পের মূল লক্ষ্য এখনো অধরা, রাষ্ট্রীয় সম্পদের অপব্যবহার, আর প্রকল্প ঘীরে বিপুল অর্থ তছরুপের অভিযোগ উঠেছে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে। যেকারণে দেশে হাজার কোটির ডাটা সেন্টার থাকার পরেও প্রায় ৩৪ হাজার সরকারি প্রতিষ্ঠানের ডাটা রাখতে হয়েছে সিঙ্গাপুরে। আর এই কারণে পরিশোধ করতে হয়েছে বিপুল পরিমাণে ডলার। ফলে চাপ বেড়েছে কেন্দ্রীয় রির্জাভে। অণ্যদিকে ঋণ নিয়ে উচ্চাভিলাসী প্রকল্প তৈরি করলেও তা মূলত কাজে আসছে না।
ভয়ংকর এই লুটপাট আর অনিয়মের সাথে অন্তত ৬ জনের সংশ্লষ্টতা মিলেছে কালবেলার অনুসন্ধানে। তারা হলেন, বিডিসিসিএলের সাবেক পরিচালক প্রফেসর মাহাবুবুর রহমান, ইনডিপেনডেন্ট ডিরেক্টর রাকিব আহমেদ, সাবেক পরিচালক আব্দুর রহমান, উপব্যবস্থাপক (ক্লাউড) ও ব্যবস্থাপক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) ক্লাউট আরজুমান্দ লুৎফা, সহকারী ব্যবস্থাপক (ক্লাউড সিকিউরিটি) মো: আশরাফুল রহমান ও ম্যানেজার (নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার) মো. ইরেশ শারওয়ার।
সফটওয়্যার কেনাকাটায় ৫৯৯ কোটি টাকার বরাদ্দ, পাইরেটেড সফটওয়্যারের অভিযোগ
প্রকল্পের ডিপিপি অনুযায়ী, ১৫২টি র্যাকসমৃদ্ধ মডুলার ডাটা সেন্টারে ৭৪৪টি ফিজিক্যাল সার্ভার স্থাপন করে প্রাথমিকভাবে ২ পেটাবাইট ফাইল স্টোরেজের ব্যবস্থা করার কথা ছিল। এই স্টোরেজ ২০০ পেটাবাইট পর্যন্ত সম্প্রসারণযোগ্য হওয়ার পরিকল্পনা ছিল। ক্লাউড কম্পিউটিং, ক্লাউড ডেস্কটপ, ক্লাউড স্টোরেজ, ডাটা স্টোরেজ, ব্যাকআপ, ডাটা নিরাপত্তা ও কো-লোকেশন সেবা দেওয়ার লক্ষ্যও নির্ধারিত ছিল। অভিযোগ রয়েছে, লাইসেন্সকৃত ক্লাউড সফটওয়্যার কেনার জন্য ডিপিপিতে ৫৯৯ কোটি টাকা বরাদ্দ থাকলেও প্রকল্পে পাইরেটেড সফটওয়্যার ব্যবহার করা হয়েছে। এতে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে প্রকল্প সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে।
এছাড়াও নিয়ম অনুযায়ী, প্রকল্পের কার্যকারিতা পরীক্ষার জন্য প্রাইমারি অ্যাকসেপ্ট্যান্স টেস্ট (PAT) এবং তার ভিত্তিতে প্রাইমারি অ্যাকসেপ্ট্যান্স সার্টিফিকেট (PAC) দেওয়ার কথা। নির্দিষ্ট সময় পরিচালনার পর ফাইনাল অ্যাকসেপ্ট্যান্স টেস্ট (FAT) সম্পন্ন করে ফাইনাল অ্যাকসেপ্ট্যান্স সার্টিফিকেট (FAC) দেওয়ার প্রক্রিয়াও রয়েছে। প্রকল্পটির ক্ষেত্রে এই প্রক্রীয় অনুসরন করা হয়নি।
রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে অকেজো শতকোটির আইটি হার্ডওয়্যার
নিয়ম অনুযায়ী প্রকল্পের কাজ শেষে প্রাইমারি একসেপ্টেন্স টেস্ট (PAT) সম্পন্ন করে পিএসি এবং নির্দিষ্ট সময় পরিচালনার পর ফাইনাল একসেপ্টেন্স টেস্ট (FAT) এর মাধ্যমে এফএসি দেওয়ার কথা। কিন্তু অজানা কারণে ভেন্ডর কোম্পানি জেডটিই-এর কাছ থেকে কাজের এই পরীক্ষা-নিরীক্ষাই সম্পন্ন করা হয়নি। দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের চরম অবহেলা, সঠিক সফটওয়্যার-হার্ডওয়্যার আপগ্রেড না করা এবং ভেন্ডরের সঙ্গে বার্ষিক রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি (AMC) না করায় নির্ধারিত মেয়াদের (Lifetime) অনেক আগেই অচল হয়ে পড়ে শত শত কোটি টাকার সার্ভার, স্টোরেজ, রাউটার, সুইচ ও ফায়ারওয়াল। ফলে ২০০ পেটাবাইট ধারণক্ষমতার সুবিশাল ক্লাউড ব্যবস্থাটি সচল করার আগেই আনুষ্ঠানিকভাবে ধ্বংসের মুখ পড়ে। এতে রাষ্টের বিপুল পরিমাণে আর্থিক ক্ষতির সম্ভাবনা রয়েছে।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে জেডটিইর ক্লাউড অকার্যকর ঘোষণা করা হয়। তবে সরকারি ডেটা স্থানান্তরের কার্যক্রম শুরু হয়েছিল ২০২২ সাল থেকেই। ক্লাউড অকার্যকর ঘোষণার আগেই বিকল্প অবকাঠামোয় ডেটা স্থানান্তরের প্রক্রিয়া চলছিল।
আইন ভেঙে সিঙ্গাপুরে ৩৪ হাজার সরকারি দপ্তরের তথ্য
জাতীয় ডাটা সেন্টার তৈরির অন্যতম লক্ষ্য ছিল সরকারি দপ্তরগুলোর তথ্য দেশের ভেতরে সংরক্ষণ এবং ক্লাউড সেবার মাধ্যমে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা। কিন্তু ২০২২ সালে জেডটিই ক্লাউডে থাকা সরকারি তথ্য ও সেবা ওরাকল ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচারে (OCI) স্থানান্তরের বিষয়টি সামনে আসে। সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, এর মধ্যে এটুআইয়ের ব্যবস্থাপনায় থাকা প্রায় ৩৪ হাজার সরকারি দপ্তরের তথ্য, সরকারি নথি ব্যবস্থাপনা এবং বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অন্তর্ভুক্ত ছিল। ওরাকলের সংশ্লিষ্ট ক্লাউড অবকাঠামো সিঙ্গাপুরে অবস্থিত।
তথ্য বলছে, জেডটিই-এর বানানো ক্লাউডটি কিছুটা হলেও সচল ছিল। অথচ ২০২২ সালে কোনো যুক্তিসঙ্গত কারণ ছাড়াই সরকারের অতিসংবেদনশীল ডেটা—যার মধ্যে ছিল এটুআই-এর অধীন সরকারের প্রায় ৩৪ হাজার দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ নথি ও অন্যান্য মন্ত্রণালয়ের গোপনীয় তথ্য— হঠাৎ করেই মাইগ্রেশন করা হয় মার্কিন প্রতিষ্ঠান ‘ওরাকল করপোরেশন’-এর সিঙ্গাপুরস্থ ‘ওরাকল ক্লাউড ইনফ্রাস্ট্রাকচারে’ (OCI)। দেশের নিজস্ব হাই-টেক ডাটা সেন্টারে তথ্য সংরক্ষণের পর্যাপ্ত অবকাঠামো ও নিরাপত্তা থাকা সত্ত্বেও বিদেশি কোম্পানির শরণাপন্ন হওয়ায় প্রতি বছর কোটি কোটি ডলারের বৈশ্বিক মুদ্রা বিল হিসেবে বিদেশে পরিশোধ করতে হয়েছে। একই সঙ্গে চরমভাবে লঙ্ঘিত হয়েছে রাষ্ট্রের ‘ডেটা লোকালাইজেশন’ নীতি, যার ফলে পুরো দেশের সরকারি গোপনীয় নথি এখন বিদেশি সংস্থার সার্ভারে ঝুঁকিতে রয়েছে।
আইটি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যেসব সরকারি দপ্তর বা প্রতিষ্ঠানের ডাটা বিদেশে স্থানান্তর করা হয়েছে সেইসব প্রতিষ্ঠানগুলা চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। যদি সব ডাট সিঙ্গাপুর থেকে ফিরিয়ে আনাও হয় তবুও ঝুঁকি থেকেই যাবে। কারণ সেখানে এই ডাটার কোনো কপি থেকে যেতে পারে। এছাড়াও কোনো ডাটা যতভাবেই মুছে ফেলা হোক না কেন সেটা রিকোভার করা যাবেই। তাই নিরাপত্তা ঝুঁকি এখানে থেকেই যায়।
দরপত্র ছাড়াই ১৮ মিলিয়ন ডলারের ওরাকল চুক্তি
সংশ্লিষ্ট তথ্য অনুযায়ী, চীনা প্রযুক্তির ক্লাউডকে পরিকল্পিতভাবে অচল দেখিয়ে ২০২১ সালের ১২ ডিসেম্বর কোনো দরপত্র ছাড়াই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতিতে (DPM) যুক্তরাষ্ট্রের কোম্পানি ওরাকলের সঙ্গে ৩ বছরের জন্য প্রায় ১ কোটি ৮০ লাখ ডলারের (প্রায় ২০০ কোটি টাকা) চুক্তি সই করে বিডিসিসিএল। বিদ্যুৎ খাতের বিতর্কিত ‘কুইক রেন্টাল’-এর মতো এই চুক্তিতেও রাখা হয়েছে একতরফা ক্যাপাসিটি চার্জের নিয়ম—অর্থাৎ ওদের ক্লাউড সেবা ব্যবহার করা হোক বা না হোক, পুরো বিলই পরিশোধ করতে হবে বিডিসিসিএলকে।
অপ্রয়োজনীয় এই ক্লাউড সেবার পেছনে প্রথম বছরে ৩০ লাখ, দ্বিতীয় বছরে ৬০ লাখ এবং তৃতীয় বছরে ৯০ লাখ ডলার গুনতে হচ্ছে রাষ্ট্রকে। উপরন্তু, গাজীপুর ডাটা সেন্টারের ১৫২টি র্যাক ধারণক্ষমতার একটি আস্ত ‘কেজ হল’ অবকাঠামোসহ সম্পূর্ণ বিনামূল্যে ওরাকলকে লিখে দেওয়া হয়েছে। চুক্তির আরও বিপজ্জনক শর্ত হলো, কোনো আইনি জটিলতা বা বিরোধ দেখা দিলে বিডিসিসিএলকে বিচার চাইতে হবে সিঙ্গাপুরের আদালতে। এমনকি চুক্তির মেয়াদ শেষে ওরাকলের সফটওয়্যার ও হার্ডওয়্যার ফেরত চলে যাবে সিঙ্গাপুরে, অর্থাৎ বাংলাদেশের হাতে থাকবে শূন্য।
পরিকল্পিত নকশা বদল ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি হারানোর ঝুঁকি
জাতীয় ডাটা সেন্টারটি প্রায় ২৮ হাজার বর্গমিটার আয়তনের কমপ্লেক্স। এর মধ্যে ডাটা সেন্টার ভবনের আয়তন প্রায় ১৬ হাজার বর্গমিটার। ভবনটিতে চারটি কেজ হল রয়েছে; প্রতিটি হলের পরিকল্পিত ধারণক্ষমতা ছিল ১৫২টি র্যাক। ৪ কিলোওয়াট ও ১০ কিলোওয়াট ক্ষমতার ৪২ইউ র্যাকের মাধ্যমে কো-লোকেশন সেবা দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়েছিল। বিদ্যুৎ, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ, নেটওয়ার্ক ও ট্রান্সমিশন সুবিধাসহ এসব র্যাক গ্রাহকদের ভাড়া দেওয়ার কথা।
প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী, ৪ কিলোওয়াট র্যাকের মাসিক সেবা মূল্য ২ লাখ ১০ হাজার টাকা এবং ১০ কিলোওয়াট র্যাকের মূল্য ৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা নির্ধারিত ছিল। গ্রাহক নিজের আইটি যন্ত্রপাতি স্থাপন করে এই সুবিধা ব্যবহার করতে পারেন। অর্থাৎ ডাটা সেন্টারের র্যাক স্পেস শুধু অবকাঠামো নয়; তা থেকে নিয়মিত আয় করারও সুযোগ রয়েছে।
কিন্তু ওরাকলের ডিআরসিসি স্থাপনের জন্য একটি কেজ হল বরাদ্দ দেওয়ার পাশাপাশি জেননেক্সট টেকনোলজির মেঘনা ক্লাউডের জন্যও ১৫২টি র্যাক স্থাপনের সক্ষমতাসম্পন্ন একটি কেজ হল বরাদ্দ দেয়া হয়। প্রদত্ত হিসাব অনুযায়ী, ডাটা সেন্টারের মোট র্যাক সক্ষমতা ৬০৪ থেকে কমে বর্তমানে ৫৩৪টিতে দাঁড়িয়েছে। ওরাকলের জন্য কেজ হলের নকশা পরিবর্তনের ফলে একটি হলের পরিকল্পিত ১৫২টি র্যাকের জায়গায় ৭৮টি র্যাকের ব্যবস্থা হয়েছে। ফলে অবকাঠামোর নকশা, র্যাক সক্ষমতা এবং কো-লোকেশন সেবা থেকে সম্ভাব্য আয়—তিনটি বিষয়েই নতুন করে হিসাব করা দরকার।
তথ্য বলছে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের বিখ্যাত ‘আপটাইম ইনস্টিটিউট’ কালিয়াকৈরের এই ডাটা সেন্টারকে ৯৯.৯৯৫% আপটাইম সক্ষমতার বিশ্বের সেরা ‘টিয়ার-৪’ সমমান সনদ (Design & Construction) দিয়েছিল। এটি ২০১৯ সালে এশিয়া-প্যাসিফিকের সেরা ডাটা সেন্টার টিম হওয়ার গৌরব অর্জন করেছিল। কিন্তু ওরাকল ও জেননেক্সটের মতো সুবিধাভোগীদের অবৈধভাবে জায়গা করে দিতে ডাটা সেন্টারের ৪টি কেজ হলের মূল নকশাই বদলে ফেলা হয়। ১৫২টি করে র্যাক থাকার কথা থাকলেও কেজ হলের পাওয়ার ও কুলিং সিস্টেমে যথেচ্ছ পরিবর্তন এনে র্যাক সংখ্যা কমিয়ে ৭৮টিতে নামিয়ে আনা হয়। ফলে বর্তমানে ৬০৪টি র্যাকের জায়গায় ডাটা সেন্টারে রয়েছে মাত্র ৫৩৪টি র্যাক। এতে বিশ্বমানের আন্তর্জাতিক সংস্থার গাইডলাইন লঙ্ঘিত হওয়ায় টিয়ার-৪ সার্টিফিকেশন ও আন্তর্জাতিক সম্মাননা হারানোর ঝুঁকিতে পড়েছে দেশের এই একমাত্র জাতীয় সম্পদ।
মেঘনা ক্লাউড: রাষ্ট্রের ২৪, জেননেক্সটের ৭৬ শতাংশ
তথ্য বলছে, ২০২২ সালের ২৯ ডিসেম্বর বাংলাদেশ ডাটা সেন্টার কোম্পানি লিমিটেড (বিডিসিসিএল) এবং জেননেক্সট টেকনোলজি লিমিটেডের (GTL) মধ্যে যৌথ উদ্যোগের চুক্তি হয়। এ চুক্তির আওতায় গড়ে ওঠে মেঘনা ক্লাউড। চুক্তির আগে ২০২২ সালের ১০ এপ্রিল জেননেক্সটের দেওয়া প্রস্তাবে বিডিসিসিএলের জন্য বিক্রয় কমিশন-পরবর্তী রাজস্বের ৩০ শতাংশ রাখার কথা ছিল। কিন্তু চূড়ান্ত চুক্তির ৬.১(ঘ) ধারায় নির্ধারিত ব্যয় ও কর-ভ্যাট সমন্বয়ের পর রাজস্ব ভাগাভাগির অনুপাত করা হয় বিডিসিসিএল ২৪ শতাংশ এবং জেননেক্সট ৭৬ শতাংশ। অর্থাৎ রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের অংশ কমেছে, আর বেসরকারি অংশীদারের অংশ হয়েছে তিন-চতুর্থাংশেরও বেশি। চুক্তিতে জেননেক্সটের বিনিয়োগের পরিকল্পনা ছিল ১২.৫৩ মিলিয়ন ডলার। এর মধ্যে মূলধনি ব্যয় (CAPEX) ৭.৬১ মিলিয়ন ডলার এবং কার্যকরী মূলধন (Working Capital) ৪.৯২ মিলিয়ন ডলার। সার্ভার, স্টোরেজ, নেটওয়ার্ক সরঞ্জাম, অফিস ও নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার (NOC), যানবাহন, শুল্ক, জরুরি ব্যয় এবং বিপণনের মতো খাত এতে অন্তর্ভুক্ত ছিল। ভবিষ্যতে আরও বিনিয়োগের প্রয়োজনের কথাও এসেছে।
এছাড়াও এ চুক্তিতে বিডিসিসিএল তাদের ১৫২টি র্যাক ধারণক্ষমতার আরেকটি মূল্যবান ‘কেজ হল’ বিনামূল্যে জেননেক্সটকে লিজ হিসেবে দিয়ে দেয়—যা অন্য কোথাও কো-লোকেশন সার্ভিস হিসেবে ভাড়া দিলে বিডিসিসিএল অন্তত ১২০ কোটি টাকা সরাসরি আয় করতে পারত। বিডিসিসিএলের জাতীয় সম্পদ, বিদ্যুৎ ও জায়গা ব্যবহার করে যে আয় হবে, তার সিংহভাগ অর্থাৎ ৭৬ শতাংশই পাবে জেননেক্সট এবং রাষ্ট্র পাবে মাত্র ২৪ শতাংশ। কোনো ন্যূনতম লিজ ফি বা গ্যারান্টিড রেভিনিউ ছাড়াই ১৫ বছরের এই দীর্ঘমেয়াদি অসম চুক্তি পুরো ডাটা সেন্টার খাতকে এক চরম অনিশ্চয়তার মুখে ঠেলে দিয়েছে। সম্প্রতি রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর জেননেক্সট সংশ্লিষ্টরা দেশ ছেড়ে পালালে এখন বিপাকে পড়েছে একাধিক গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের সংরক্ষিত ডেটা।
অব্যবহৃত সম্পদ, শতকোটির লোকসান ও অস্পষ্ট ভবিষ্যৎ
বিডিসিসিএলের অপরিকল্পিত সিদ্ধান্ত ও অসাধু কর্মকর্তাদের কারণে ডাটা সেন্টারের অধিকাংশ সম্পদই অব্যবহৃত ফেলে রাখা হয়েছে। একেকটি কেজ হল খালি ফেলে রেখে বা বিনামূল্যে বিদেশি ও পছন্দের প্রাইভেট কোম্পানিকে দিয়ে রাখা হলেও নিজস্ব ক্লাউড সেবা বিক্রির কোনো কৌশলই নেওয়া হয়নি। সব মিলিয়ে বিগত কয়েক বছরে ভুল সিদ্ধান্ত, অসম চুক্তি এবং লুটপাটের কারণে ডাটা সেন্টার খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের ক্ষতি হয়েছে অন্তত ৫০০ কোটি টাকারও বেশি। একদিকে চীনের ঋণের কিস্তি শোধের চাপ, অন্যদিকে ওরাকল ও মেঘনা ক্লাউডের পেছনে ডলার পাচার—দুইয়ের জাঁতাকলে পড়ে দেশের একমাত্র ফোর-টায়ার ডাটা সেন্টারটি এখন অদম্য সম্ভাবনার বদলে রাষ্ট্রের এক প্রকাণ্ড বোঝা ও ডেটা নিরাপত্তার জন্য বিশাল হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
জানতে চাইলে বিডিসিসিএলের সাবেক পরিচালক প্রফেসর মাহাবুবুর রহমান কালবেলাকে বলেন, আসলে আমি তো টেকনিক্যাল মানুষ। আমি টেকনিক্যাল বিষয়গুলো দেখেছি এখন চুক্তির বিষয়ে তো আমি কিছু বলতে পারব না। আর বোর্ডে আসলে ওই সময় আমাদের কিছু করারও ছিলো না। ওরাকলের সাথে চুক্তির বিষয়ে বলেন, ওই সময় মন্ত্রী (জুনায়েদ আহমেদ পলক) সাহেব নিজে এসে বসে থাকতেন। এখন একজন মন্ত্রী বসে থাকলে সেটা ডিনাই করার সাহস কার আছে! তিনি বিষয়গুলো আরও ব্যাখ্যা করে বলেন, ‘জাতীয় ডাটা সেন্টারের বিষয়গুলো বোর্ডের যৌথ সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই নেওয়া হয়েছিল । তৎকালীন সময়ে ওরাকলের (Oracle) ভ্যাট ও শুল্ক (CD/VAT) সংক্রান্ত কিছু প্রশাসনিক জটিলতা থাকার কারণে চুক্তি অনুযায়ী সাথে সাথে ওরাকল চালু করা সম্ভব হয়নি। পরবর্তীতে যখন চুক্তিপত্র বোর্ডে উপস্থাপন করা হয়, তখন প্যানেল আইনজীবী ও লিগ্যাল টিম পুরো বিষয়টি যাচাই-বাছাই করেই অনুমোদন দেয়। আমি প্রকৌশলী (Engineer) হিসেবে শুধু কারিগরি বা টেকনিক্যাল বিষয়গুলো দেখেছি, আইনি বা আর্থিক চুক্তির বিষয়গুলো লিগ্যাল প্যানেলের আইনজীবীরাই পর্যালোচনা করেছেন ।”
সিংগাপুরে তথ্য পাঠানো ও জিটুজি (G2G) প্রজেক্টের বিষয়ে বলেন, ‘ওরাকল প্রস্তুত না থাকায় বাধ্য হয়েই সেই সময়ে তথ্য বাইরে পাঠাতে হয়েছিল। এছাড়া জিটুজি (G2G) প্রকল্পের মাধ্যমে আনা যন্ত্রাংশ বা ফ্যাসিলিটিগুলো যখন বসেই ছিল, তখন একটি জরুরি প্রয়োজনে জেননেক্সট একটি প্রস্তাব নিয়ে আসে। তারা পুরো মেশিনপত্র এনে ক্লাউড সেটআপের মাধ্যমে মুনাফার নির্দিষ্ট অংশ দেওয়ার প্রস্তাব করে। কিন্তু যৌথ চুক্তি এভাবে করা যাবে কি না, তা পর্যালোচনার জন্য একটি কমিটি করা হয়। সেই কমিটিতে এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান আব্দুর রহমান সাহেবসহ (বর্তমানে বিশ্বব্যাংকে আছেন) সংশ্লিষ্ট জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা ছিলেন। প্রকল্পটিতে কারিগরি প্রতিনিধি হিসেবে দেশের বাইরে থেকে পড়াশোনা করে আসা তরুণেরা (যেমন জামিল চৌধুরী স্যারের ছেলে সাইফ) যুক্ত ছিল। আমাদের কাছে মনে হয়েছিল দেশীয় অভিজ্ঞ ছেলেরা যদি নিজস্ব প্রযুক্তিতে কাজ শুরু করতে চায়, তবে তা ভালো উদ্যোগ। তবে চুক্তি সম্পাদন পর্যন্ত তারা এগোলেও পরবর্তীতে কাঙ্ক্ষিত ইনভেস্টমেন্ট তারা করতে পারেনি। অর্থায়নের ঘাটতির কারণে তারা মাত্র এক-দুটি র্যাক এনে প্রাথমিক কাজ শুরু করলেও শেষ পর্যন্ত বড় কোনো ক্লাউড ইনভেস্টমেন্ট করতে ব্যর্থ হয়। যেকারণে প্রকল্পটি আসলে ফেইল করে।
সহকারী ব্যবস্থাপক (ক্লাউড সিকিউরিটি) মো: আশরাফুল রহমান বলেন, ‘প্রকল্পের সময়ে আমি অফিসে কর্মরত ছিলাম এবং মূলত ক্লাউড সিকিউরিটির দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলাম। যেসব বিষয়ে অভিযোগের কথা বলা হচ্ছে, তার প্রতিটি বিষয়েই সুনির্দিষ্ট যুক্তিসঙ্গত কারণ (Justification) রয়েছে— কেন, কীভাবে এবং কী পরিস্থিতিতে এসব সিদ্ধান্ত বা কাজ হয়েছিল। তবে এসব বিষয়ে প্রাতিষ্ঠানিক বক্তব্য দেওয়া বা মন্তব্য করার জন্য আমি উপযুক্ত ব্যক্তি নই। আমরা সবাই প্রজেক্টে দায়িত্বপালনকারী কর্মকর্তা হিসেবে কাজ করেছি। এ সংক্রান্ত যেকোনো প্রশ্ন বা প্রাতিষ্ঠানিক ব্যাখ্যার জন্য বিডিসিসিএল-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) মহোদয়ের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি ও তাঁর দপ্তর এ বিষয়ে সঠিক ও বিস্তারিত বক্তব্য প্রদান করতে পারবেন।”
ম্যানেজার (নেটওয়ার্ক অপারেশন সেন্টার) মো. ইরেশ শারওয়ার কালবেলাকে বলেন, ‘এসব অভিযোগ নেহায়েত ষড়যন্ত্র ও চক্রান্ত। ২৪-এর গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই একটি পক্ষ খুব বাজেভাবে আমাদের ডাটা সেন্টারের পেছনে লেগেছে। ডাটা সেন্টার কোনো ব্যক্তিগত বিষয় নয়, এটি একটি জাতীয় সম্পদ ও পাবলিক প্রপার্টি। এভাবে অহেতুক বিতর্ক সৃষ্টি করে এটিকে নষ্ট করলে জাতীয় এই সম্পদটিই মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। ব্যক্তিগতভাবে আমার বিরুদ্ধে অতীতে কোনো কিছু প্রমাণিত হয়নি এবং ভবিষ্যতে প্রমাণিত হওয়ার কোনো সুযোগও নেই।” তিনি আরও বলেন, “আমরা মূলত আইটি ও টেকনিক্যাল লাইনের মানুষ। যেসব জায়গায় কেনাকাটা (প্রকিউরমেন্ট) বা লজিস্টিকসের কাজ হয় কিংবা নীতি নির্ধারণের (ডিসিশন মেকিং) সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়, দুর্নীতি সাধারণত সেই জায়গাগুলোতেই হয়ে থাকে। আমাদের শুধু বলা হয় যে টেন্ডারের মাধ্যমে অমুক জিনিস প্রকিউর বা কেনা হয়েছে এবং তোমরা তা ইমপ্লিমেন্ট করো; আমরা কেবল বাস্তবায়নের কাজটুকুই করি তাই টেকনিক্যাল দায়িত্বে থাকা কর্মচারীদের ওপর অনিয়মের দায় চাপানো নেহায়েত মানুষকে নাজেহাল করার চেষ্টা ছাড়া আর কিছুই নয়।’









