মঙ্গলবার | ২১ এপ্রিল, ২০২৬ | ৮ বৈশাখ, ১৪৩৩

উচ্ছেদ অভিযানের পর ক্যাম্পাসে ফিরেছে স্বস্তি

স্টাফ রিপোর্টার

দীর্ঘদিনের বিশৃঙ্খল ও অপরিচ্ছন্ন চিত্র এখন অনেকটাই পাল্টে গেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় (ঢাবি) ক্যাম্পাসের। একসময় তীব্র যানজট, ভাসমান দোকান, মাদকাসক্ত ও উদ্বাস্তুদের আনাগোনায় নাকাল ছিল চত্বরগুলো। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন, ডাকসু ও ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের উদ্যোগে ধারাবাহিক উচ্ছেদ অভিযানের পর ক্যাম্পাসে শিক্ষার্থীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে ।

গতকাল শনিবার বিকালে সরেজমিনে বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসি, রাজু ভাস্কর্য, কার্জন হল, মেট্রোরেল এলাকা, ফুলার রোডসহ বিভিন্ন চত্বর ঘুরে দেখা যায়, আগের তুলনায় অবৈধ দোকানপাট অনেকটাই উধাও। ভবঘুরে ও মাদকাসক্তদের আনাগোনা কমেছে, কমেছে যানজটও।

বিশেষ করে মেট্রোরেলের ঢাবি স্টেশনের সামনে, যেখানে আগে শতাধিক রিকশার কারণে নিয়মিত যানজট লেগেই থাকত, সেখানে এখন অনেকটাই সুশৃঙ্খল পরিবেশ।

রোকেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী মায়মুনা আক্তার বলেন, ক্যাম্পাসে অনেকটা সুশৃঙ্খল পরিবেশ দেখা যাচ্ছে। আগে টিএসসির মোড়ে যত্রতত্র গাড়ি, রিকশা দাঁড়িয়ে থাকার ফলে জ্যাম লেগেই থাকত। কিন্তু এখন সেই দৃশ্য আর নেই। আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে চলাচল করতে পারছি।

বঙ্গমাতা ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হলের শিক্ষার্থী আয়েশা সিদ্দিকা বলেন, ক্যাম্পাসজুড়ে কিছুটা স্বস্তি এসেছে, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বিরাজ করছে। তবে ক্যাম্পাসের কিছু কিছু জায়গা এই স্বস্তিকর পরিবেশ এখনো ফেরেনি।

তিনি বলেন, টিএসসি, মেট্রোরেল, ভিসি চত্বর, মল চত্বর এবং ফুলার রোড এলাকা থেকে ভবঘুরে-মাদকাসক্তদের উচ্ছেদ করা হলেও তারা একেবারে ক্যাম্পাস ত্যাগ করে চলে যায়নি। বরং তারা কবি সুফিয়া কামাল হল এলাকা, ফজিলাতুন্নেছা মুজিব হল এলাকায় গিয়ে আস্তানা গেড়েছে। এ কারণে আমরা অনেকটা নিরাপত্তাঝুঁকিতে থাকি।

ডাকসুর কার্যনির্বাহী সদস্য সর্বমিত্র চাকমা বলেন, যে ভবঘুরেরা রাতে ক্যাম্পাসে থাকে, তারা দিনের বেলা মাত্র ১০০ টাকার বিনিময়ে প্রেস ক্লাবের সামনে মিছিল-মিটিং করে। আমরা দেখেছি, এই মানুষগুলোর পেছনে কাজ করছে সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট। যারা মাদক, চাঁদাবাজি ও রাজনৈতিক ভাড়াটে কর্মকাণ্ডে জড়িত। এই লোকদের অনেকেই নিজেকে ফুল বিক্রেতা বা হকার পরিচয় দেয়, কিন্তু আসলে তারা মাদক চক্রের সদস্য।

তিনি বলেন, আমরা চাই একটি নিরাপদ ক্যাম্পাস, যেখানে নারী শিক্ষার্থীরা হয়রানির শিকার হবে না, শিক্ষকরা নির্ভয়ে চলাফেরা করতে পারবেন। এজন্য প্রয়োজনে কঠোর অবস্থান নিতে প্রস্তুত।

ডাকসুর সমাজসেবা সম্পাদক এবি জুবায়ের বলেন, মাদক কারবারি, ভ্রাম্যমাণ দোকানি, ভবঘুরে ও অবৈধ দোকানমুক্ত নিরাপদ ক্যাম্পাস নিশ্চিত করা আমাদের মৌলিক দায়িত্ব। প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করেই আমরা কাজ করছি। কারণ, শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা রক্ষাই আমাদের কাজ।

তিনি অভিযোগ করেন, নিরাপদ ক্যাম্পাস পুনর্গঠনের উদ্যোগ নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন মহল আমাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা প্রচার চালাচ্ছে। কিন্তু আমরা কোনো অন্যায় কাজ করছি নাÑশিক্ষার্থীদের ম্যান্ডেট নিয়ে শিক্ষার্থীদের স্বার্থেই কাজ করছি।

অন্যদিকে, উচ্ছেদ অভিযানের পর বিশ্ববিদ্যালয়জুড়ে কিছু বিতর্কও তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের এই উদ্যোগের বিরোধিতা করে বামপন্থি ছাত্র সংগঠনগুলোর একাংশ হকারদের পক্ষে বিক্ষোভে নামে। ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রমৈত্রী, সমাজতান্ত্রিক ছাত্র ফ্রন্টসহ বাম সংগঠনগুলোর নেতাকর্মীরা এ উচ্ছেদ অভিযানকে ‘অমানবিক’ হিসেবে আখ্যায়িত করেন। তারা বলছেন, ডাকসু নেতারা বল প্রয়োগের মাধ্যমে নিরীহ দোকানিদের তাড়িয়ে দিচ্ছেন।

এ প্রসঙ্গে সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. সামিনা লুৎফা ডাকসুর কার্যক্রমকে ‘গুন্ডামি’ আখ্যা দিয়ে বলেন, উচ্ছেদ বা সহিংসতা কোনো শিক্ষার্থীর কাজ হতে পারে না। পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. কামরুল হাসান মামুন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে লেখেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের আদর্শ মানবিকতা শেখানো। সহিংসতার পথ শিক্ষা নয়।

অভিযানের বিরোধিতা প্রসঙ্গে ডাকসুর জিএস এসএম ফরহাদ বলেন, ঢাবির স্টেকহোল্ডার শুধু শিক্ষক, শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারী। মাদক কারবারি বা অবৈধ হকারদের কোনো স্থান বিশ্ববিদ্যালয়ে হতে পারে না। হয় ডাকসু থাকবে, নয়তো সিন্ডিকেটÑদুটি একসঙ্গে নয়।

ডাকসুর ভিপি আবু সাদিক কায়েম বলেন, বিতাড়িত ছাত্রলীগের অনুপস্থিতিতে ক্যাম্পাসে নতুন অপরাধী চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্রই এখন হকার ও ভবঘুরে নামের আড়ালে মাদক ও চাঁদাবাজির সিন্ডিকেট চালাচ্ছে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর সাইফুদ্দিন আহমেদ বলেন, অনেকে বলছে ডাকসু পরিচ্ছন্নতা অভিযান চালাতে পারে না। কিন্তু আমাদের জেনে রাখা দরকারÑ৭৩-এর অধ্যাদেশ অনুযায়ী ডাকসু একটি স্বীকৃত স্বাধীন প্রতিষ্ঠান। এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনের সহযোগী প্রতিষ্ঠান। কাজেই ডাকসু বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনেরই একটি অংশ।

তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন এবং ডাকসুর যৌথ উদ্যোগে বিশ্ববিদ্যালয়ের সুষ্ঠু পরিবেশ নিশ্চিত করতে আমরা বদ্ধপরিকর। পাশাপাশি ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশও আমাদের সহায়তা করছে।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক

মোঃ ইউনুছ আলী

স্বত্ব © ২০২৫ মাতৃভূমির দৈনিক চিত্র

অনুসরণ করুন

যোগাযোগ : ৭১, পুস্প প্লাজা (চতুর্থ তলা), কারওয়ান বাজার, ঢাকা – ১২১৫।
ফোন : +৮৮ ০১৯২৯-৩৬৫২২৯। মেইল : dailychitro123@gmail.com

Design & Developed by : Rose IT BD