রাজবাড়ীর পাংশা উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সিরাজপুর হাওরের কোলঘেঁষা কলিমোহর গ্রামে ১৯৪২ সালের ১৫ নভেম্বর এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন একেএম রফিক উদ্দিন পান্না। তাঁর পিতা খলিল উদ্দিন মিয়া ছিলেন বিচার বিভাগের একজন জেলা জজ, যাকে মানুষ শ্রদ্ধাভরে ‘জজ সাহেব’ নামে চিনতেন। মাতা জহুরুন নেসা।
বরিশাল জেলা স্কুল থেকে ১৯৫৮ সালে ম্যাট্রিকুলেশন, ঢাকা কলেজ থেকে ১৯৬০ সালে ইন্টারমিডিয়েট এবং ১৯৬৪ সালে ঢাকা ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ (বর্তমান বুয়েট) থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে বিএসসি ডিগ্রি অর্জন করেন তিনি। পরবর্তীতে জাপান থেকে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং ও ম্যানেজমেন্ট বিষয়ে প্রশিক্ষণ নেন।
কর্মজীবনের শুরুতে সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করার পর ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠা করেন Development Design Consultants Ltd. (DDC)। সময়ের সঙ্গে প্রতিষ্ঠানটি দেশ-বিদেশে প্রকৌশল ও অবকাঠামো উন্নয়নের ক্ষেত্রে পরিচিতি লাভ করে। শত শত প্রকৌশলী, টেকনোক্র্যাট, অর্থনীতিবিদ, সমাজবিজ্ঞানীসহ বিপুলসংখ্যক কর্মকর্তা-কর্মচারীর কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয় তাঁর প্রতিষ্ঠানে।
তবে তাঁর সবচেয়ে বড় পরিচয় শুধু একজন প্রকৌশলী বা উদ্যোক্তা হিসেবে নয়—তিনি ছিলেন নিজের শিকড়ের মানুষের জন্য একজন নীরব দাতা ও সমাজসেবক।
নিজ জন্মভূমি পাংশা ও রাজবাড়ীর বিভিন্ন এলাকায় তাঁর দান-অনুদানে নির্মিত হয়েছে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও একাধিক ভবন। পাংশা কলেজের ‘জহুরুন নেসা ভবন’, মাছপাড়া ডিগ্রি কলেজের ‘খলিল উদ্দিন কলাভবন’, মাজুরিয়া ‘জোহরা জেরিন’ উচ্চ বিদ্যালয় ভবন, হোসেনডাঙ্গার ‘নিলুফার রফিক উচ্চ বিদ্যালয়’, বনগ্রামের ‘একেএম রফিকউদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় ভবন’, গোপালপুরের ‘রাফাত রেষাদ কলেজিয়েট উচ্চ বিদ্যালয় ভবন’, কলিমোহরের ‘খলিল উদ্দিন মিয়া দাখিল মাদ্রাসা ও এতিমখানা’ এবং ‘কলিমোহর জহুরুননেসা স্কুল অ্যান্ড কলেজ’—এগুলো তাঁর জনকল্যাণমূলক কাজের স্মারক।
কৃষি ও কৃষকের উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রত্যন্ত গ্রামীণ পরিবেশে প্রতিষ্ঠা করেন কলিমোহর জহুরুননেসা কৃষি ইনস্টিটিউট। প্রতিষ্ঠানটিকে ভবিষ্যতে কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপ দেওয়ার স্বপ্নও তিনি দেখেছিলেন।
পিতার স্মৃতিকে অমর করে রাখতে প্রতিষ্ঠা করেন ‘খলিল উদ্দিন মিয়া ওয়েলফেয়ার ফাউন্ডেশন’। মানুষের মধ্যে জ্ঞানচর্চা ও ধর্মীয় সম্প্রীতি বৃদ্ধির উদ্দেশ্যে গড়ে তোলেন সর্বধর্মীয় পাঠাগার। কলিমোহরে আধুনিক হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগও নেন, যার লক্ষ্য ছিল পর্যায়ক্রমে ৫০ শয্যায় উন্নীত করা।
শুধু প্রতিষ্ঠান নির্মাণ নয়—কলিমোহরের রাস্তাঘাট, অবকাঠামো ও সামগ্রিক উন্নয়নেও তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। তাঁর উদ্যোগ ও অর্থায়নে নিজের জন্মভূমিকে একটি আদর্শ গ্রামে রূপ দেওয়ার প্রচেষ্টা ছিল চোখে পড়ার মতো।
প্রকৌশল জগতেও তাঁর অবদান স্মরণীয়। তাঁর প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনায় ১৯৯৩ সালে প্রকাশিত হয় প্রকৌশল জগতের গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ ‘বাংলাদেশ বিল্ডিং কোড’। তাঁর অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি লাভ করেন ‘জসীম উদ্দীন স্বর্ণপদক’।
২০২২ সালে তিনি পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে যান। কিন্তু মানুষের কল্যাণে নির্মিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, কৃষি উদ্যোগ, অবকাঠামো ও বিভিন্ন জনহিতকর স্থাপনার মধ্য দিয়ে তিনি রেখে গেছেন এক দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার।
মানুষ চলে যায়, কিন্তু মানুষের জন্য করা কাজ থেকে যায়।
একেএম রফিক উদ্দিন পান্না তাই শুধু একজন প্রকৌশলীর নাম নয়—তিনি রাজবাড়ীর মাটি ও মানুষের জন্য নিবেদিত এক নীরব কর্মযজ্ঞের নাম।
আল্লাহ তাঁর সকল নেক আমল কবুল করুন এবং তাঁকে জান্নাতুল ফেরদৌস নসিব করুন। আমিন।









