বুধবার | ১৭ জুন, ২০২৬ | ৩ আষাঢ়, ১৪৩৩

গাজীপুর

হিসাব দিতে নারাজ গাজীপুর সিটি কর্পোরেশন এবার মন্ত্রণালয়ের কাঠগড়ায় ‎

বিশেষ প্রতিনিধি

যে সিটি কর্পোরেশন সাধারণ জনগণের ট্যাক্সের টাকার হিসাব দিতে নারাজ, সেই শীর্ষ স্থানীয় স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানটিই এবার সরকারের উচ্চপর্যায়ের হিসাবের কাঠগড়ায় এসে দাঁড়িয়েছে। গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-কে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার সাংবিধানিক অধিকার খর্ব করার যে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে, তা মন্ত্রণালয়ের সাম্প্রতিক এক নজিরবিহীন সাঁড়াশি অভিযানের আদেশে এক ভিন্ন মোড় নিয়েছে। সচেতন মহলের মতে, স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের কঠোর তদন্ত এড়াতেই কর্পোরেশনের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট রাতারাতি তথ্য ধামাচাপা দেওয়ায়  মেতে উঠেছে।

‎অনুসন্ধানে জানা যায়, গত ১২ই মে ২০২৬ তারিখে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ (প্রশাসন-১ শাখা) থেকে একটি ঐতিহাসিক অফিস আদেশ জারি করা হয় (যার স্মারক নম্বর: ৪৬.০০.০০০০.০৩৯.০১৮.০১৩.২০২৬-৮৮৪)। এই প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে ২০০৯ সালের জানুয়ারি হতে ২০২৬ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত—দীর্ঘ ১৭ বছরের সার্বিক কার্যক্রমে কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতি হয়েছে কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের জন্য ৭ সদস্যের একটি উচ্চপর্যায়ের ‘অনুসন্ধান কমিটি’ গঠন করা হয়েছে।

‎এই প্রজ্ঞাপনের ধারাবাহিকতায় গত ১৬ জুন ২০২৬ তারিখে সিটি কর্পোরেশন-১ শাখা থেকে অপর এক জরুরি আদেশে আগামী ৭ কার্যদিবসের মধ্যে দেশের সকল সিটি কর্পোরেশনের বিগত ১৭ বছরের দুর্নীতির সার্বিক প্রতিবেদন (হার্ড ও সফটকপিসহ) জরুরি ভিত্তিতে মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করার চূড়ান্ত নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

‎মন্ত্রণালয়ের এই সাঁড়াশি অভিযানের মুখে এখন চরম কাঁপন ধরেছে গাজীপুর নগর ভবনের  দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের  বুকে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন—এই তদন্তের মাধ্যমে কি শেষ পর্যন্ত বেরিয়ে আসবে বিগত দেড় দশকের কোটি কোটি টাকার টেন্ডারবাজি, ভুয়া মাস্টাররোল শ্রমিক নিয়োগ, আর প্রকল্প বরাদ্দ লোপাটের রোমহর্ষক কাহিনী? এই প্রজ্ঞাপনের ধাক্কায় সিটি কর্পোরেশনের ভেতরের দুর্নীতির বিষফোঁড়া কতটুকু জনসম্মুখে ভেসে আসে, এখন সেটাই দেখার বিষয়। নাকি বরাবরের মতোই ফাইল গায়েবের নাটকে ঢাকা পড়ে যাবে রাঘববোয়ালদের নাম—এই নিয়ে চলছে জোর আলোচনা।

‎ঠিক যখন মন্ত্রণালয় বিগত ১৭ বছরের হিসাব চেয়ে আলটিমেটাম দিয়েছে, ঠিক তখনই গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনে তথ্য লুকিয়ে দুর্নীতি ধামাচাপা দেওয়ার এক নগ্ন উৎসব শুরু হয়েছে। জানা গেছে, গত ১১ জুন ২০২৬ তারিখে গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে তথ্য অধিকার আইনের নির্ধারিত ‘ফরম-ক’ এর মাধ্যমে একটি আনুষ্ঠানিক আবেদন জমা দেন এক গণমাধ্যমকর্মী (যার দাপ্তরিক ডেসপাস পত্র নম্বর- ৭২৭)।

‎আবেদনে মূলত ৪টি সুনির্দিষ্ট পয়েন্টে ৫ আগস্ট ২০২৪ এবং ২৮ শে ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের সিটি কর্পোরেশনের অত্যন্ত স্পর্শকাতর কিছু তথ্য জানতে চাওয়া হয়, যার মধ্যে রয়েছে—নগর ভবনের বর্তমান ব্যাংক ব্যালেন্স, অবশিষ্ট তহবিল ও বিতর্কিত ঠিকাদারি বিল সংক্রান্ত নথিপত্র।

‎আবেদনটি দাপ্তরিকভাবে গ্রহণ করা হলেও, মন্ত্রণালয়ের তদন্তের খবর জানাজানি হওয়ার পর দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তা আবেদনকারীকে ডেকে নিয়ে তথ্য দিতে সরাসরি অস্বীকৃতি জানান। ওই কর্মকর্তা মৌখিকভাবে সাফ জানিয়ে দেন, “আপনি যে তথ্য চেয়েছেন, সেটি দেওয়া যাবে না। আপনি যা চেয়েছেন সেটা প্রশাসকও চান না।একই সাথে নিজের আইনি দায়িত্ব এড়াতে তিনি আবেদনকারীকে বলেন, তথ্য নিতে হলে ফাইলটি প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার (সিইও) কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হবে, সেখান থেকে বুঝে নিতে।

‎সংশ্লিষ্ট আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, গাজীপুর সিটি কর্পোরেশনের এই আচরণ স্পষ্টত আইনের লঙ্ঘন ও সীমাহীন ক্ষমতার অপব্যবহার:
‎৯(১) ও ৯(৩) এর ধারা স্পষ্ট লঙ্ঘন:তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ অনুযায়ী, দায়িত্বপ্রাপ্ত তথ্য কর্মকর্তা আবেদন পাওয়ার পর নিজ দায়িত্বে তথ্য সরবরাহ করতে বাধ্য। যদি কোনো তথ্য আইনগত কারণে দেওয়া সম্ভব না হয়, তবে আবেদনের ২০ বা ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে সুনির্দিষ্ট আইনি কারণ ব্যাখ্যা করে লিখিতভাবে আবেদনকারীকে জানাতে হবে। মুখের কথায় বা কর্মকর্তার খেয়ালখুশিতে তথ্য প্রদানে অস্বীকৃতি জানানোর কোনো সুযোগ আইনে নেই। তথ্য কর্মকর্তা নিজেই যেখানে তথ্য দাতা, সেখানে আবেদনকারীকে সরাসরি তথ্য না দিয়ে “প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে ফাইল পাঠিয়ে দেওয়া হবে” বলা আইনসম্মত নয়। এটি তথ্য কর্মকর্তার নিজস্ব আইনি দায়িত্ব এড়ানোর শামিল।

‎জনগণের ট্যাক্সের টাকায় পরিচালিত এই প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব ও ঠিকাদারি বিলের তথ্য গোপন করার এই মরিয়া চেষ্টা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, ৫ আগস্ট ২০২৪ এবং ২৮ ফেব্রুয়ারি ২০২৬ তারিখের ফান্ডের হিসাব ও ঠিকাদারদের কোটি কোটি টাকা বিল প্রদানের তালিকায় এমন কী গোপন নথি রয়েছে যা প্রকাশ পেলে “প্রশাসন”-এর ভিত নড়ে উঠবে?

‎অভিযোগ উঠেছে, মন্ত্রণালয়ের তদন্ত কমিটি আসার পূর্বেই ব্যাকডেটেড (পেছনের তারিখের) চেকে কোটি কোটি টাকা তুলে নিয়ে তহবিল শূন্য করার এক অভিনব অপচেষ্টা চলছে। আর এই কারণেই তথ্য কর্মকর্তাকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে মূল ফাইলের তথ্য গোপন রাখা হচ্ছে।

‎এ বিষয়ে ভুক্তভোগী আবেদনকারী সংবাদমাধ্যমকে জানান, আইন কোনো ব্যক্তি, সিইও বা প্রশাসকের খেয়ালখুশিতে চলতে পারে না। সরকারি দপ্তরের তহবিলের হিসাব জানার অধিকার দেশের প্রতিটি নাগরিকের আছে। যেহেতু তারা আইন অমান্য করে মৌখিকভাবে আবেদনটি প্রত্যাখ্যান করেছে, তাই আমি তথ্য অধিকার আইনের ধারা ২৪ অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে আপিল কর্তৃপক্ষের কাছে আনুষ্ঠানিক আপিল আবেদন দাখিল করব।

‎এ বিষয়ে তথ্য কর্মকর্তাকে একাধিকবার ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
‎এমন কি তারপর হোয়াটসঅ্যাপে  বার্তা প্রেরণ করলেও তিনিও তার উত্তর দেননি।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক

মোঃ ইউনুছ আলী

স্বত্ব © ২০২৫ মাতৃভূমির দৈনিক চিত্র

অনুসরণ করুন

যোগাযোগ : ৭১, পুস্প প্লাজা (চতুর্থ তলা), কারওয়ান বাজার, ঢাকা – ১২১৫।
ফোন : +৮৮ ০১৯২৯-৩৬৫২২৯। মেইল : dailychitro123@gmail.com

Design & Developed by : Rose IT BD