শনিবার | ২ মে, ২০২৬ | ১৯ বৈশাখ, ১৪৩৩

সিগারেটে রাজস্ব ফাঁকি ৫১৮২ কোটি: গবেষণা

স্টাফ রিপোর্টার

দেশে অন্যান্য পণ্য সর্বোচ্চ খুচরা বিক্রয়মূল্যে বিক্রি হলেও সিগারেট ও বিড়ির ক্ষেত্রে সেই নিয়ম পুরোপুরি মানা হচ্ছে না বলে একটি গবেষণায় উঠে এসেছে। উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলো খুচরা মূল্যে বিক্রেতাদের কাছে সিগারেট সরবরাহ করলেও বিক্রেতারা নির্ধারিত সর্বোচ্চ দামের চেয়ে বেশি দামে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করছেন। ফলে প্যাকেটের গায়ে উল্লিখিত সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বাজারে অনেক বেশি দামে সিগারেট বিক্রি হচ্ছে।

গবেষণা অনুযায়ী, বিক্রয়মূল্যের ভিত্তিতে যথাযথভাবে কর আদায় করা গেলে চলতি অর্থবছরেই অতিরিক্ত ৫ হাজার ১৮২ কোটি টাকা রাজস্ব আয় সম্ভব হতো। দীর্ঘদিন ধরে তামাকজাত দ্রব্যের বিক্রিতে এ ধরনের মূল্য কারসাজির কারণে বিপুল অংকের রাজস্ব ফাঁকি দিচ্ছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো। ‘সিগারেটের বাজার নিয়ন্ত্রণে কোম্পানির কৌশল ও রাজস্ব আদায়ে এর প্রভাব : একটি সমীক্ষা’ শীর্ষক গবেষণায় এ তথ্য উপস্থাপন করা হয়।

বৃহস্পতিবার (৫ মার্চ) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির শফিকুল কবির মিলনায়তনে ‘তামাক কোম্পানির মূল্য কারসাজি ও কর ফাঁকি রোধে করণীয়’ শীর্ষক আলোচনা সভায় গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবনের অর্থনৈতিক গবেষণা ব্যুরো এবং বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসি যৌথভাবে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

 

গবেষণার মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর টোব্যাকো ট্যাক্স পলিসির গবেষণা সহকারী ইশরাত জাহান ঐশী।

তিনি জানান, মাঠ পর্যায়ে সংগৃহীত তথ্যে দেখা গেছে, অতিউচ্চ স্তরে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রির কারণে রাজস্ব ফাঁকি হয়েছে ৫১০ দশমিক ৩১ কোটি টাকা। একইভাবে উচ্চ স্তরে ১২৪ দশমিক ৪০ কোটি টাকা, মধ্যম স্তরে ১ হাজার ৯২৫ দশমিক ৫৮ কোটি টাকা এবং নিম্ন স্তরে ২ হাজার ৬২১ দশমিক ২৪ কোটি টাকা রাজস্ব ফাঁকি হয়েছে।

গবেষণায় ঢাকা, বরিশাল, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগের বিভাগীয় শহরসহ আরও দুটি জেলা শহর মিলিয়ে মোট ১২টি শহর থেকে তথ্য সংগ্রহ করা হয়। প্রতিটি শহর থেকে চারটি করে মোট ৪৮টি খুচরা বিক্রয়কেন্দ্রের তথ্য নেওয়া হয়েছে। ধূমপান ও তামাকজাত দ্রব্য ব্যবহার (নিয়ন্ত্রণ) আইন অনুযায়ী সংজ্ঞায়িত পাবলিক প্লেসের খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র থেকে এসব তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

গবেষণায় কয়েকটি সুপারিশ তুলে ধরা হয়। এর মধ্যে রয়েছে সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যে সিগারেট বিক্রি নিশ্চিত করা এবং নিয়ম অমান্যকারীদের শাস্তির আওতায় আনা। পাশাপাশি পূর্ববর্তী অবৈধ কার্যক্রমের জন্যও দায়ীদের জবাবদিহির আওতায় আনার কথা বলা হয়। কর আদায় ও বাজার মনিটরিংয়ে গুরুত্ব দিয়ে ডিজিটাল পদ্ধতি চালু ও বাস্তবায়নের সুপারিশ করা হয়। এছাড়া সিগারেটের খুচরা শলাকা বিক্রি নিষিদ্ধ করা, সিগারেটের বহু স্তর কমিয়ে একটি স্তরে আনা, অ্যাডভেলরেম কর পদ্ধতির পরিবর্তে নির্দিষ্ট হারে কর আরোপের ব্যবস্থা চালু করা এবং তামাক কোম্পানির সঙ্গে সরকারের অংশীদারিত্ব প্রত্যাহার করে বিকল্প রাজস্ব উৎস অনুসন্ধানের প্রস্তাব দেওয়া হয়।

অনুষ্ঠানে বিশেষজ্ঞ আলোচক হিসেবে বক্তব্য দেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগের অধ্যাপক ও গবেষণা কার্যক্রমের সংশ্লিষ্ট কনভেনর অধ্যাপক রুমানা হক, তামাকমুক্ত রেলওয়ে প্রকল্পের কনসালটেন্ট ও জাতীয় তামাক নিয়ন্ত্রণ সেলের সাবেক সমন্বয়কারী হোসেন আলী খোন্দকার এবং জনস্বাস্থ্য ও নীতি বিশ্লেষক অ্যাডভোকেট সৈয়দ মাহবুবুল আলম। সভায় সভাপতিত্ব করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার ন্যাশনাল প্রফেশনাল অফিসার ড. সৈয়দ মাহফুজুল হক। স্বাগত বক্তব্য দেন প্রকল্প ব্যবস্থাপক হামিদুল ইসলাম।

আলোচকরা বলেন, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সিগারেট বিক্রির কারণে যে রাজস্ব ক্ষতি হচ্ছে, তার পরিমাণ দেশের একাধিক মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের বার্ষিক বাজেটের সমান। এ অর্থ দিয়ে সারাদেশে হৃদরোগের চিকিৎসা বিনামূল্যে দেওয়ার মতো উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হতো। তারা রাজস্ব ফাঁকির স্থায়ী সমাধানের দাবি জানান এবং বিষয়টি নিয়ে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের গবেষণাভিত্তিক কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের আহ্বান জানান।

তারা আরও বলেন, সর্বোচ্চ খুচরা মূল্যের চেয়ে বেশি দামে বিক্রির মাধ্যমে কেবল রাষ্ট্রীয় আর্থিক ক্ষতি হচ্ছে না, বরং তরুণদের ধূমপানের দিকে আকৃষ্ট করার ক্ষেত্রও তৈরি হচ্ছে। এর পেছনে খুচরা শলাকা বিক্রির প্রচলন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। খুচরা শলাকা বিক্রি নিষিদ্ধ করার দাবি জানানো হলেও এখনো তা বাস্তবায়ন হয়নি বলে তারা উল্লেখ করেন। তাদের মতে, খুচরা শলাকা বিক্রির কারণে রাজস্ব ফাঁকি বাড়ছে এবং তরুণদের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। একইসঙ্গে স্বাস্থ্য সতর্কবার্তা কার্যকরভাবে দেখার সুযোগও সীমিত হচ্ছে।

আলোচনা সভায় বিভিন্ন তামাকবিরোধী সংগঠনের প্রতিনিধিরা ও সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। তারা গবেষণার বিষয়ে মতামত দেন এবং প্রশ্নোত্তর পর্বে অংশ নেন।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক

মোঃ ইউনুছ আলী

স্বত্ব © ২০২৫ মাতৃভূমির দৈনিক চিত্র

অনুসরণ করুন

যোগাযোগ : ৭১, পুস্প প্লাজা (চতুর্থ তলা), কারওয়ান বাজার, ঢাকা – ১২১৫।
ফোন : +৮৮ ০১৯২৯-৩৬৫২২৯। মেইল : dailychitro123@gmail.com

Design & Developed by : Rose IT BD