দিন দিন প্রবীণদের সংখ্যা বাড়লেও দেশের একমাত্র সরকারি প্রবীণ হাসপাতালটির অবস্থা করুণ। অর্থের অভাবে হাসপাতালটির বিভিন্ন উন্নয়নকাজ বন্ধ হয়ে আছে। যার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সেবা নিতে আসা রোগীদের ফিরে যেতে হচ্ছে। নামে প্রবীণ হাসপাতাল হলেও এখানে বয়স্কদের উপস্থিতি কম।
রাজধানীর আগারগাঁওয়ে প্রবীণ ভবনে অবস্থিত ‘বাংলাদেশ প্রবীণ হিতৈষী সংঘ ও জরা বিজ্ঞান প্রতিষ্ঠান’ (বাইগাম)। সমাজসেবা অধিদপ্তরে নিবন্ধিত প্রতিষ্ঠানটির ওই ভবনে রয়েছে ৫০ শয্যার এ প্রবীণ হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউট অব জেরিয়েট্রিক মেডিসিন (আইজিএম)। রয়েছে একটি প্রবীণ নিবাসও।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, হাসপাতালটিতে ডিজিটাল এক্স-রে মেশিন, মেমোগ্রাফি যন্ত্র, আইসিইউসহ অনেক গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্রপাতি নেই। যার কারণে অনেক ক্ষেত্রেই সেবা নিতে আসা রোগীদের ফিরে যেতে হচ্ছে। নামে প্রবীণ হাসপাতাল হলেও এখানে প্রবীণদের উপস্থিতিই কম। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বরাদ্দকৃত অর্থছাড় হয়নি অর্থ মন্ত্রণালয় থেকে। এতে হাসপাতালটির বিভিন্ন উন্নয়নকাজ আটকে আছে।
সরজমিনে দেখা যায়, হাসপাতালটিতে অপেক্ষারত অনেক রোগী রয়েছে। তবে তাদের মধ্যে প্রবীণদের সংখ্যা হাতেগোনা। রোগী ও প্রবীণ নিবাসে বসবাসকারীদের জন্য দুটি অ্যাম্বুলেন্স আছে। তবে সংশ্লিষ্টরা জানান, অ্যাম্বুলেন্স দুটি চিকিৎসকদের আনা-নেয়া ছাড়া আর কোনো কাজে ব্যবহার হয় না। অস্ত্রোপচার কক্ষ থাকলেও সেখানে অস্ত্রোপচার হয় না বললেই চলে।
২০২২ সালের জনশুমারি ও গৃহগণনার প্রতিবেদন অনুযায়ী, দেশে ৬০ বছরের বেশি বয়সী মানুষের সংখ্যা ১ কোটি ৫৩ লাখ ২৬ হাজার ৭১৯। তারা মোট জনসংখ্যার ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ। ২০১১ সালের জনশুমারিতে এ হার ছিল ৭ দশমিক ৪৭ শতাংশ। দেশের মানুষের গড় আয়ু বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রবীণ মানুষের সংখ্যাও বাড়ছে। জনশুমারি অনুযায়ী, দেশে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার কমলেও প্রবীণ জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বেশি। জাতিসংঘ জনসংখ্যা তহবিলের পূর্বাভাস অনুযায়ী, দেশে ২০২৫-২৬ সালে প্রবীণের সংখ্যা হবে দুই কোটি। ২০৫০ সালে তা বেড়ে হবে সাড়ে চার কোটি, যা মোট জনসংখ্যার ২১ শতাংশ।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক হাসপাতালে কর্মরত একজন চিকিৎসক বণিক বার্তাকে বলেন, ‘বাংলাদেশের বয়োজ্যেষ্ঠদের সেবায় প্রবীণ হাসপাতাল একটি অনন্য প্রতিষ্ঠান। তবে দীর্ঘ সময় ধরে বাজেটস্বল্পতা এবং জনবল সংকটে প্রতিষ্ঠানটিকে নানা ধরনের সীমাবদ্ধতার সম্মুখীন হতে হচ্ছে। চিকিৎসক ও নার্সের সংখ্যা রোগীর তুলনায় ঠিকঠাক থাকলেও এখানে রোগী তুলনামূলক কম। যেভাবে সাড়া পাওয়ার কথা আমরা সেভাবে পাচ্ছি না। কারণ প্রচারণা নেই। তহবিলের অভাবে আমরা তা করতে পরছি না। এছাড়া তহবিল সংকটের কারণে অন্যান্য উন্নয়নকাজও আটকে আছে। এখানে আসা রোগীরা বার্ধক্যজনিত জটিল রোগে আক্রান্ত থাকেন। কিন্তু অনেক ক্ষেত্রেই ডায়াগনস্টিক সেন্টারে আধুনিক ইমেজিং মেশিন (যেমন উন্নত মানের এমআরআই বা সিটি স্ক্যান) ও ল্যাবরেটরিতে সব ধরনের জরুরি পরীক্ষার সুবিধা নেই। ফলে সঠিক রোগ নির্ণয়ে বিলম্ব হয়। বিনামূল্যে বা স্বল্পমূল্যে ওষুধ দেয়ার কথা থাকলেও স্টকে প্রয়োজনীয় ওষুধের অভাব থাকে।’
প্রবীণদের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে ১৯৬০ সালে মেডিসিন বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক একেএম আবদুল ওয়াহেদ রাজধানীর ধানমন্ডিতে তার বাসভবনে বাইগাম গড়ে তুলেছিলেন। পরে সরকারের সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীনে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হতে শুরু করে। ১৯৮৫ সালে সংঘের কার্যালয় আগারগাঁওয়ে নেয়া হয়। তখন সরকারের পক্ষ থেকে এক একর জমি বরাদ্দ দিয়ে একতলা একটি ভবন করে দেয়া হয়। ১৯৯৮ সালে ৫০ শয্যার হাসপাতাল চালু হয়। বর্তমানে প্রবীণ ভবনটি চারতলা। এ ভবনেই বাইগামের কমিটির নির্বাচিত সদস্য ও সংঘের অন্য কর্মীরাও বসেন।
প্রতিষ্ঠানটির মহাসচিব মো. ইন্তেজার রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘এটি তো জেনারেল হাসপাতাল। তাই এখানে সবাই আসে। আমাদের প্রবীণ নিবাসে যারা আছেন তাদের আমরা এখানে বিনামূল্যে চিকিৎসা দিয়ে থাকি। আর যারা এ হাসপাতালের সদস্য হন তারা ৫০ শতাংশ কম খরচে চিকিৎসা নিতে পারেন। আমাদের এখানকার মূল সমস্যা হলো আর্থিক সংকট। দেশে প্রবীণ মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। তাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বিশেষ উদ্যোগ নেয়ার কথা বহু বছর ধরে বলে আসছেন বিশেষজ্ঞরা। তবে তার কিছুই নেয়া হয়নি।’
তিনি আরো বলেন, ‘এ অর্থবছরের ছয় মাস অতিবাহিত হলেও একটি টাকাও পাওয়া যায়নি। প্রবীণদের নিয়ে কেউ ভাবে না। রোগীদের খাবার ও ভেতরকার পরিবেশ আরো উন্নত করা দরকার। ওষুধ সরবরাহ বাড়ানো দরকার। টাকার অভাবে আইসিইউ করতে পারছি না। পাঁচ-সাতজন দৈনিক রোগী ভর্তি থাকে। ডিজিটাল এক্স-রে, মেমোগ্রাফি মেশিন নেই। আসলে এগুলো থাকা দরকার।’
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে ও তথ্যানুসন্ধানে জানা গেছে, প্রবীণ হিতৈষী সংঘ যেভাবে পরিচালিত হওয়ার কথা ছিল, দীর্ঘদিন তার ব্যত্যয় ঘটেছে। এর আগের কমিটিগুলোয় যারা ছিলেন, তারা এর উন্নয়নে তেমন অবদান রাখেননি। তাই এ সময় হাসপাতালটিও টেকসই কোনো ব্যবস্থাপনার আওতায় ছিল না। প্রতিষ্ঠানটির নিজস্ব আয় খুবই কম। এ পরিস্থিতির মধ্যেও অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় বিলাসী ব্যয় হয়েছে। বনভোজন ও নির্বাচনের মতো কর্মকাণ্ডে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হয়েছে। এর হোস্টেলও কোনো মানদণ্ডেই যুগোপযোগী নয়। বিনোদনের কোনো ব্যবস্থা নেই। প্রবীণ নিবাসের কক্ষগুলোয় প্রয়োজনীয় সুবিধা নেই। খাওয়ার জায়গাটিও স্বাস্থ্যসম্মত নয়।
স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়ের স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. সাইদুর রহমান বণিক বার্তাকে বলেন, ‘প্রবীণদের জন্য এটি দেশের প্রথম দিকের প্রতিষ্ঠান। তাদের জন্য বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। অর্থছাড় হয়েছে কিনা দেখতে হবে। তদন্তে দেখা গেছে, মাঝে তাদের কিছু আর্থিক অনিয়ম ছিল। এরপর তাদের বরাদ্দ কমে যায়। আমরা প্রতিষ্ঠানটির উন্নয়ন প্রত্যাশা করছি। সরকারি বরাদ্দের পাশাপাশি তাদের নিজস্ব আয় বাড়াতে হবে। তা না হলে প্রতিষ্ঠানটি মানুষের প্রত্যাশ পূরণ করতে পারবে না।’









