রাজবাড়ীর কালুখালী ও গোয়ালন্দ উপজেলায় নিষিদ্ধ চায়না দোয়ারি জাল জব্দ করে ধ্বংসের ঘটনায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে জালের সঙ্গে থাকা বিপুল পরিমাণ স্টিলের জিআই (GI) রিংয়ের হিসাব নিয়ে। স্থানীয়দের অভিযোগ, আগুনে জাল পুড়িয়ে ধ্বংস করা হলেও স্টিলের রিংগুলো অক্ষত থাকার কথা। অথচ সেই রিং কোথায় গেছে, বিক্রি করা হয়েছে কি না, বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে কি না—এসব প্রশ্নের সদুত্তর দিতে পারেননি সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
গত ২৫ জুন কালুখালী উপজেলার কালিকাপুর ইউনিয়নের শিকদারপাড়া এলাকায় নিষিদ্ধ চায়না দোয়ারি জাল তৈরির একটি কারখানায় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করেন কালুখালীর সহকারী কমিশনার (ভূমি) সামস্ শাদাত মাহমুদ উল্লাহ। অভিযানে প্রায় ৬ লাখ টাকা মূল্যের ২৬০ পিস নিষিদ্ধ চায়না দোয়ারি জাল এবং কারখানার বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ ও বাজেয়াপ্ত করা হয়। পরে জব্দকৃত জালগুলো ঘটনাস্থলেই আগুন দিয়ে ধ্বংস করা হয়। এ সময় কালুখালী থানা পুলিশের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। অভিযানে সার্বিক সহায়তা প্রদান করেন কালুখালী ও গোয়ালন্দ উপজেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত ভারপ্রাপ্ত উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম (পাইলট)।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, ধ্বংস করা ২৬০টি জালের মোট দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় সাড়ে ১০ হাজার মিটার। স্থানীয় জাল ব্যবসায়ী ও পূর্বের উৎপাদনকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি চায়না দোয়ারি জালে প্রায় ১০টি গোলাকার স্টিলের জিআই রিং এবং ৩৫ থেকে ৪০টি স্কয়ার রিং ব্যবহৃত হয়। প্রতিটি জালে এসব রিংয়ের ওজন আনুমানিক ৪ থেকে সোয়া ৪ কেজি এবং জালসহ মোট ওজন প্রায় ৬ কেজি। সে হিসাবে ধ্বংস করা ২৬০টি জালে প্রায় ১ হাজার ৪০ কেজি স্টিলের রিং থাকার কথা বলে সংশ্লিষ্টরা দাবি করেছেন। স্থানীয় ভাঙারি ব্যবসায়ীদের তথ্য অনুযায়ী, আগুনে পোড়া এসব রিংয়ের বাজারদর কেজিপ্রতি প্রায় ৩৫ টাকা। সেই হিসাবে রিংগুলোর সম্ভাব্য মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩৬ হাজার টাকা।
এই অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে সরেজমিনে কালুখালী উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার কার্যালয়ে গেলে। উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম (পাইলট) জেলা মিটিং এ থাকলে, সেখানে উপস্থিত কর্মচারীদের নিকট জানতে চাইলে তারা জানান, আমরা এ বিষয়ে কোন কথা বলতে পারবো না। যা জানার আপনি কষ্ট করে স্যারের কাছে জানেন বা উনার থেকে তথ্য নেন।
পরবর্তীতে মুঠোফোনে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা আনোয়ারুল ইসলাম (পাইলট)-এর কাছে জানতে চাওয়া হয়—জাল ধ্বংসের পর অবশিষ্ট স্টিলের রিংয়ের পরিমাণ কত ছিল, সেগুলো বিক্রি করা হয়েছে কি না, বিক্রি হয়ে থাকলে কোন বিধি অনুসরণ করে বিক্রি করা হয়েছে এবং বিক্রির অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে কি না।
জবাবে উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা বলেন, “আমি আগুন দিয়ে ইউএনও অফিসের কর্মচারীদের দায়িত্বে রেখে চলে আসি। পরে সেগুলো কোথায় গেছে বা কী অবস্থায় আছে, তা আমি জানি না।”
একইভাবে গোয়ালন্দ উপজেলায় জব্দ করা ৫৭টি চায়না দোয়ারি জাল ধ্বংসের পর অবশিষ্ট স্টিলের রিংয়ের হিসাব জানতে চাইলে তিনি কোনো সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি।
জব্দকৃত আলামত সংরক্ষণের দায়িত্ব সম্পর্কে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “এ নিয়ে তো আমি কোলে করে বসে থাকবো না। ইউএনও অফিসের কর্মচারীরা ছিলেন, দায়িত্ব তাদের। এখন রক্ষক যদি ভক্ষক হয়, কিছু করার থাকে না।
অপরদিকে, মৎস্য কার্যালয়ের উপস্থিত কর্মচারীদের কাছ থেকেও এ বিষয়ে কোনো সুস্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি। তারা প্রশ্নের সরাসরি উত্তর না দিয়ে এড়িয়ে যান।
উপরোক্ত বিষয়ে কালুখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোঃ মেজবাহ উদ্দিন জানান, এসিল্যান্ড মোবাইল কোর্ট পরিচালনা করেন। পরে, জব্দকৃত আলামত মৎস্য কর্মকর্তার জিম্মায় দেওয়া হয়। সেখান হতে কোন অনিয়ম হলে বা জব্দ কৃত আলামত খোয়া গেলে এর দায় মৎস্য কর্মকর্তার। কারণ এর লয়াল মৎস্য কর্মকর্তা। যদি এরকম কিছু হয়ে থাকে, আমরা তদন্ত করে দেখবো ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবো।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তাকে এ বিষয়ে প্রশ্ন করায় তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। তিনি অযৌক্তিক যুক্তি উপস্থাপন করেন।
এ ঘটনায় সচেতন মহলের প্রশ্ন—জব্দকৃত জালের স্টিলের রিংগুলো বর্তমানে কোথায়? সেগুলো বিক্রি হয়ে থাকলে সেই অর্থ কার কাছে গেছে? সরকারি কোষাগারে জমা হয়েছে কি না? যদি কোনো হিসাব না থাকে, তবে জব্দকৃত সরকারি আলামত রক্ষণাবেক্ষণের দায়ভার কার?
স্থানীয়দের দাবি, বিষয়টি নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জব্দকৃত আলামতের পূর্ণাঙ্গ হিসাব প্রকাশ, দায় নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে মৎস্য বিভাগের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হোক।









