কেরালার ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করেছেন তরুণ আইনজীবী ফাতিমা তাহিলিয়া। বামপন্থীদের দীর্ঘদিনের শক্ত ঘাঁটি পেরাম্ব্রা আসনে জয়ী হয়ে তিনি ভারতীয় ইউনিয়ন মুসলিম লীগের (আইইউএমএল) প্রথম নারী প্রতিনিধি হিসেবে রাজ্য আইনসভায় প্রবেশ করেছেন।
নির্বাচনে তাহিলিয়া মোট ৮১ হাজার ৪২৯ ভোট পেয়ে তার নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী টি.পি. রামকৃষ্ণনকে ৫ হাজার ৮৭ ভোটের ব্যবধানে পরাজিত করেন। রামকৃষ্ণন কেরালার বাম গণতান্ত্রিক জোটের (এলডিএফ) শীর্ষ নেতা হিসেবে পরিচিত।
এই ফলাফলকে এলডিএফের জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। কারণ, ২০২১ সালের নির্বাচনে একই আসনে রামকৃষ্ণন ২২ হাজারের বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন। ফলে পেরাম্ব্রার এই পরিবর্তন মালাবার অঞ্চলের ভোটারদের রাজনৈতিক মনোভাবের গুরুত্বপূর্ণ রূপান্তরের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, তাহিলিয়ার বিজয় শুধু একটি আসনের ফল নয়; এটি মুসলিম নারীদের রাজনৈতিক অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে একটি তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি। অতীতে আইইউএমএল খুব কম নারী প্রার্থী মনোনয়ন দিয়েছে এবং ২০২৬ সালের আগে মনোনীত দুই নারীই পরাজিত হয়েছিলেন।
ছাত্ররাজনীতি থেকেই তাহিলিয়ার উত্থান। তিনি মুসলিম স্টুডেন্টস ফেডারেশনের (এমএসএফ) রাজনীতিতে সক্রিয় ছিলেন এবং এর নারী শাখা ‘হারিতা’র প্রতিষ্ঠাতা রাজ্য সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ২০১২ সাল থেকে সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত থাকা তাহিলিয়া পরবর্তীতে স্থানীয় সরকারেও সফলতা দেখান—২০২০ সালে কোঝিকোড সিটি করপোরেশনের কুট্টিচিরা ওয়ার্ড থেকে কাউন্সিলর নির্বাচিত হন।
নির্বাচনী প্রচারণায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের কৌশলগত ব্যবহার করে তিনি প্রবীণ ভোটারদের কাছে পৌঁছান এবং তাদের কল্যাণ ও জীবিকার বিষয়গুলো সামনে আনেন। তার প্রচারণায় অংশ নেন ভারতের জাতীয় কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী।
পেশাগতভাবে তিনি কোঝিকোড জেলা আদালতে আইনজীবী হিসেবে কর্মরত। ত্রিশূরের সরকারি আইন কলেজ থেকে স্নাতকোত্তর সম্পন্ন করেছেন তিনি।
সামাজিক ইস্যুতেও তাহিলিয়ার সক্রিয়তা রয়েছে। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ, নারীর অধিকার রক্ষা এবং মুসলিম নারীদের শিক্ষার প্রসারে তিনি দীর্ঘদিন কাজ করে আসছেন। হিজাবকে ব্যক্তিগত ও ধর্মীয় পরিচয়ের অংশ হিসেবে রক্ষার পক্ষেও তিনি সরব অবস্থান নিয়েছেন।
তবে তার রাজনৈতিক পথচলা চ্যালেঞ্জহীন ছিল না। অভিজ্ঞতার অভাব নিয়ে দলের ভেতরেই প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়েছে তাকে। এমনকি এমএসএফের জাতীয় সহ-সভাপতির পদ থেকেও তাকে বহিষ্কার করা হয়। পরবর্তীতে তিনি অভিযোগ করেন, সংগঠনের কিছু জ্যেষ্ঠ নেতা নারীদের প্রতি অশালীন আচরণ করেছেন এবং তাদের কণ্ঠরোধের চেষ্টা করেছেন। ২০২১ সালের আগস্টে তার নেতৃত্বে একদল নারী এ বিষয়ে রাজ্য মহিলা কমিশনে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও দায়ের করেন।
সব বাধা অতিক্রম করে ফাতিমা তাহিলিয়ার এই জয় কেরালার রাজনীতিতে নতুন অধ্যায় সূচনার পাশাপাশি নারী নেতৃত্বের সম্ভাবনাকে আরও দৃঢ়ভাবে সামনে নিয়ে এসেছে।









