দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ঐতিহাসিক ডি-ডে অভিযানের বার্ষিকী অনুষ্ঠানে ইউরোপের অভিবাসন নীতির তীব্র সমালোচনা করেছেন মার্কিন প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথ। তিনি অভিযোগ করেছেন, ইউরোপীয় দেশগুলো তাদের উপকূলে চলমান অভিবাসী আগ্রাসন ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
ফ্রান্সের নরম্যান্ডিতে আয়োজিত অনুষ্ঠানে দেওয়া বক্তব্যে হেগসেথ বলেন, ৮২ বছর আগে মিত্রবাহিনীর সৈন্যরা নাৎসি অধিকৃত ইউরোপকে মুক্ত করতে যেসব সৈকতে অবতরণ করেছিলেন, আজ সেই ইউরোপই ভিন্ন ধরনের হুমকির মুখোমুখি।
তিনি বলেন, দুঃখজনকভাবে আজ ইউরোপের বিভিন্ন সৈকতে অন্য ধরনের বিপজ্জনক মতাদর্শ আক্রমণ চালাচ্ছে। স্পেন, ইতালি, গ্রিস এবং বুলগেরিয়ার উপকূলে নৌকা ভরে মানুষ আসছে। ইউরোপের রাজধানীগুলো কবে এই আগ্রাসনের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে?
নরম্যান্ডির অনুষ্ঠানে হেগসেথ আরও বলেন, ডি-ডের পরবর্তী দশকগুলোতে ইউরোপের কিছু রাজধানী তাদের অর্জিত স্বাধীনতাকে খুব সহজভাবে নিতে শুরু করেছে। স্বাধীনতা বিনা মূল্যে আসে না; এই সত্য অনেকেই ভুলে গেছে।
তার মতে, যারা এখানে যুদ্ধ করেছে এবং প্রাণ দিয়েছে, তারা ইউরোপে স্বাধীনতা ফিরিয়ে এনেছিল। বর্তমান প্রজন্মের নেতা ও যোদ্ধাদের সেই স্বাধীনতা রক্ষা করতে হবে। অন্যথায় তাদের আত্মত্যাগ সাময়িক অর্জনে পরিণত হবে।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে অভিবাসন ইউরোপীয় রাজনীতির অন্যতম প্রধান ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। কঠোর অভিবাসনবিরোধী অবস্থান নেওয়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের জনপ্রিয়তাও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রশাসনও অভিবাসন নিয়ন্ত্রণকে তাদের অন্যতম প্রধান নীতিগত অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচনা করছে। সীমান্ত নিরাপত্তা ও অভিবাসন আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলোর জন্য অতিরিক্ত কয়েক বিলিয়ন ডলার বরাদ্দ চাওয়া হয়েছে।
হেগসেথের এই বক্তব্যকে ট্রাম্প প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে ইউরোপের অভিবাসন নীতির বিরুদ্ধে আরেকটি প্রকাশ্য সমালোচনা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
এর একদিন আগে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও একই ধরনের মন্তব্য করেন। তিনি গত বছর ইংল্যান্ডের সাউদাম্পটনে ছুরিকাঘাতে নিহত ১৮ বছর বয়সী শিক্ষার্থী হেনরি নোভাকের মৃত্যুর জন্য অভিবাসীদের ব্যাপক আগ্রাসনকে দায়ী করেন।
ভ্যান্স দাবি করেন, এই পরিস্থিতির একমাত্র উপযুক্ত প্রতিক্রিয়া হলোর ন্যায়সঙ্গত ক্ষোভ।
তবে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী কার্যালয় ডাউনিং স্ট্রিট এ মন্তব্যের সমালোচনা করে। তারা জানায়, গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় বাইরের কারও হস্তক্ষেপের চেষ্টা গ্রহণযোগ্য নয়।
একইসঙ্গে হেনরি নোভাকের পরিবারও তাদের ছেলের মৃত্যুকে বিভাজন সৃষ্টির রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার না করার আহ্বান জানিয়েছে।
যুক্তরাজ্যের উপপ্রধানমন্ত্রী ডেভিড ল্যামিও সতর্ক করে বলেন, রাজনীতিবিদদের বক্তব্য দেওয়ার ক্ষেত্রে অত্যন্ত সতর্ক ও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন।
বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আমরা এমন এক অনলাইন পরিবেশে বাস করছি, যা খুব দ্রুত বিষাক্ত হয়ে উঠতে পারে। হেনরি নোভাকের ঘটনা বিশ্বজুড়ে আলোচিত হওয়ার পেছনে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, ইউরোপে সমুদ্রপথে অভিবাসী আগমনের সর্বোচ্চ সংখ্যা দেখা যায় ২০১৫ সালে। সে বছর ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ১০ লাখের বেশি মানুষ ইউরোপে প্রবেশ করে। সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ এবং আফগানিস্তানের সংঘাত থেকে পালিয়ে আসা শরণার্থীরা ওই ঢলের বড় অংশ ছিল।
২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত যুক্তরাজ্য, গ্রিস, ইতালি, স্পেন ও সাইপ্রাসে সমুদ্রপথে মোট ১ লাখ ৬৯ হাজার ৩৪১ জন অভিবাসী পৌঁছেছেন। এর মধ্যে প্রায় ২৩ শতাংশ যুক্তরাজ্যে প্রবেশ করেছেন।
সূত্র : বিবিসি









