কুমিল্লার বুড়িচং উপজেলার রামচন্দ্রপুর গ্রামে পুলিশের উপর হামলার অভিযোগে দায়ের করা একটি মামলায় নিরপরাধ দুই শিশুসন্তানসহ শেফালী আক্তার ও লিজা আক্তার নামে দুই গৃহবধূকে গ্রেফতার করে হয়রানীর অভিযোগ ওঠেছে। গত ৩ জুন রাতের ওই ঘটনায় পুরুষশূন্য বাড়ি থেকে তাদের আটক করে পরদিন সন্ধ্যায় আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠায়। এ ঘটনাকে হয়রানীমূলক দাবি করেন ভুক্তভোগী দুই গৃহবধূর পরিবার। এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও মামলা থেকে অব্যাহতি চেয়ে রোববার (১৪ জুন) বিকালে নগরীর টমছমব্রিজ এলাকার সৈয়দ ম্যানশনে সংবাদ সম্মেলন করেন শেফালী আক্তারের স্বামী কুমিল্লা নগরীর বাগিচাগাঁও এলাকার বাসিন্দা মো. নেয়ামুল কবির।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে মো. নেয়ামুল কবির বলেন, তার স্ত্রী শেফালী আক্তারের ৫ ভাই। এদের মধ্যে মো. আলিম পুলিশের এসআই, আক্তার হোসেন এটিএসআই, মান্নান সৌদি প্রবাসী এবং ইকবাল ও জালাল ব্যবসায়ী। দুই ভাই জালাল ও মান্নানের মধ্যে টাকার লেনদেন এবং ভাইদের মধ্যে তাদের নতুন ও পুরাতন বাড়ির ভাগ-বন্টন নিয়ে মান্নান ও আক্তার হোসেনের সাথে ইকবাল ও জালালের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। এসব বিরোধকে কেন্দ্র করে মান্নান তার স্ত্রী শিল্পী বেগম ও পুত্র রবিউল গত ২ জুন রাতে ইকবালকে মারধর করে। স্থানীয়রা আহত ইকবালকে উদ্ধার করে বুড়িচং উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে। পর দিন শিল্পী বেগম তার দেবর এটিএসআই আক্তার হোসেনের সহায়তায় বাড়িতে পুলিশ আনেন। পুলিশ ইকবালের রক্তমাখা কাপড়-চোপড় দেখতে পেলেও ইকবালের পরিবারকেই শাসিয়ে যায়। এ খবর পেয়ে তার বড় ভাই এসআই মো. আলিম সকলকে শান্ত থাকতে বলেন এবং পারিবারিকভাবে ঘটনার মিমাংসা করে দেবেন বলে জানান। এতে এসআই মো. আলিমের প্রতিও ক্ষুব্ধ হন মান্নান। মান্নানের দাবি, নতুন বাড়ির ইকবালের অংশ আগে দিতে হবে, না হয় মিমাংসায় বসবে না। পরদিন রাতে মান্নান বহিরাগত লোকজনসহ ইকবাল ও জালালের ঘরে ঢুকে তাদের গালমন্দসহ অতর্কিতভাবে পরিবারের লোকজনের উপর হামলা চালায় এবং এলোপাতারী মারধর করে আহত করে অজ্ঞাতনামা লোকজন পালিয়ে যায়। পরে ইকবাল ও জালালসহ আহতদের চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। নেয়ামুল কবির অভিযোগ করে বলেন, এদিন গভীর রাতে পুলিশের একটি দল ওই বাড়িতে গিয়ে ইকবাল, জালালসহ অন্যদের না পেয়ে তার স্ত্রী শেফালী আক্তার, আহত ইকবালের স্ত্রী লিজা আক্তার ও তার দুই শিশু কন্যা মিম (১), মরিয়মকে (৩) টানা-হেচড়া করে পুলিশের গাড়িতে তুলে নিয়ে যায়। পুলিশ তাদেরকে ভারতের বর্ডার এলাকাসহ বিভিন্ন জায়গায় সারারাত ঘুরানোর সময় বলে তারা পুলিশের উপর হামলা করেছে। এতে শেফালী ও লিজা ভীত-সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ে। এসময় পুলিশ ভয়-ভীতি দেখিয়ে শেফালী ও লিজার কাছ থেকে তাদের ব্যবহৃত মোবাইল ফোন, স্বর্ণালংকার ও কিছু নগদ টাকা নিয়ে যায় এবং ভোরে পুলিশ তাদের থানায় নিয়ে নিজেদের মতো করে কাগজপত্রে স্বাক্ষর নেয়। তখন পুলিশ তাদের বলে, তারা ইকবাল ও জালালকে থানায় আনতে পারলে তাদের ছেড়ে দেবে। পুলিশের ভয়ে এলাকা ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ায় তারা ইকবাল ও জালালকে থানায় হাজির করতে পারেনি। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে পুলিশের উপর হামলার অভিযোগে দেবপুর পুলিশ ফাঁড়ির এএসআই ফরহাদ মিয়া বাদী হয়ে থানায় একটি মামলা করেন। এ মামলায় জড়িয়ে শেফালী এবং লিজা ও তার দুই শিশু সন্তানসহ পর দিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় আদালতে পাঠায়। দুই শিশু লিজার হলেও পুলিশ দুই শিশু দুইজনের উল্লেখ করে। দীর্ঘসময় পুলিশ হেফাজতে অভুক্ত থাকায় দুই শিশুসহ শেফালী ও লিজা অসুস্থ হয়ে পড়লেও পুলিশ তাদের খাবার ও চিকিৎসার ব্যবস্থা করেনি। এক সপ্তাহ কারাভোগের পর তারা গত বৃহস্পতিবার জামিন লাভ করেন। পরদিন কারাগার থেকে বের হওয়ার পর অসুস্থ দুই শিশুসন্তানসহ তাদের কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।
মামলার বরাত দিয়ে সংবাদ সম্মেলনে নেয়ামুল কবির আরও বলেন, ৩ জুন রাতে হামলাকারী অপরিচিত এবং সিভিল পোষাকের ৩ জন লোক পুলিশের সদস্য ছিলেন বলে জেনেছেন। মো. আলিম পুলিশের এসআই পদে কর্মরত থাকার বিষয়টি থানা পুলিশ নিশ্চিত হওয়ার পরও এজাহারের ভেতরের বর্ণনায় রহস্যজনকভাবে ‘মো: আলিম’ নামটি জড়িয়ে দেয়া হয়েছে। মান্নানের স্ত্রী শিল্পী বেগম দেবপুর পুলিশ ফাঁড়িতে পূর্বে একটি অভিযোগ দিয়েছেন। ৩ জুন বাড়িতে পুলিশ গেলেও শিল্পী বেগমের অভিযোগ সংক্রান্তে কোন রকম তদন্ত বা কাউকে জিজ্ঞাসাবাদ করেনি পুলিশ। যে ঘটনা দেখিয়ে এএসআই ফরহাদ মিয়া অভিযোগ করেছেন, সেই ঘটনাস্থলে এবং ঘটনার সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না। এএসআই ফরহাদ মিয়ার মোবাইল লোকেশন যাচাই করলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া যাবে। মামলার বাদী এএসআই ফরহাদ মিয়া পক্ষাবলম্বনপূর্বক মিথ্যা তথ্যের ভিত্তিতে অতিউৎসাহী হয়ে নিজে বাদী হয়ে মামলাটি দায়ের করেছেন।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, ভাইয়ে-ভাইয়ে সংঘাত ও পুলিশকে লেলিয়ে দেয়ার উস্কানিদাতা এটিএসআই আখতার হোসেন। সে বিভিন্ন জায়গায় নিজেকে দারোগা পরিচয় দিয়ে মানুষকে হয়রানি, নাজেহাল ও চাঁদাবাজীসহ নানান অপকর্ম করে আসছে। মিথ্যা তথ্য ও প্রতারণার মাধ্যমে সে এ পর্যন্ত তিনটি বিয়ে করেছে। সে অবৈধ ও অনৈতিক সম্পর্কে জড়িয়ে এলাকায়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেক কেলেঙ্কারির ঘটনা ঘটিয়েছে। আখতার হোসেন দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় জুয়ার আসর চালিয়ে আসছে এবং থানা-পুলিশকে ম্যানেজ করে জুয়ার আসর পরিচালনা করছে বলে এলাকায় প্রচারণা রয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে ভূক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তার মাধ্যমে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক পুলিশ প্রশাসনের সাথে বিভ্রান্তি এড়াতে এবং পুলিশ কর্তৃক হয়রানি ও মিথ্যা অভিযোগে হয়রানীর হাত থেকে রক্ষার জন্য দাবি জানানো হয়।









