বুধবার | ১৯ আগস্ট, ২০২৬ | ৪ ভাদ্র, ১৪৩৩

ইরানজুড়ে ছড়িয়ে পড়েছে সরকারবিরোধী বিক্ষোভ

স্টাফ রিপোর্টার

ইরানে অর্থনৈতিক সংকটের জেরে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভ আরো ছড়িয়ে পড়েছে। রাজধানী তেহরান ছাড়াও কোম, ইসফাহান, বন্দর আব্বাস ও বোজনুর্দ শহরে গতকাল বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। সরকার বিক্ষোভ দমনে ইন্টারনেট ও টেলিফোন লাইন বন্ধ করে দেয়ায় ও ফ্লাইট চলাচল বন্ধ থাকায় দেশটি কার্যত বহির্বিশ্ব থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে। দেশজুড়ে চলা এ বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর দমন-পীড়নে অন্তত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন বলে জানিয়েছে মানবাধিকার সংস্থাগুলো। খবর বিবিসি, রয়টার্স ও ফক্স নিউজ।

বিক্ষোভের সময় রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ‘ইসলামিক রিপাবলিক অব ইরান ব্রডকাস্টিং’ (আইআরআইবি) ভবনে আগুন দেয়ার দাবি করেছে বিক্ষোভকারীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে দেখা গেছে, ইরানের মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানে রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন ‘আইআরআইবি’ ভবনে বিক্ষোভকারীরা আগুন ধরিয়ে দিচ্ছেন। তবে দেশটিতে ইন্টারনেট ও সংবাদমাধ্যমের ওপর কঠোর কড়াকড়ি থাকায় এ তথ্যের সত্যতা স্বতন্ত্রভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এদিকে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা হলে ইরানকে ‘কঠোর’ জবাব দেয়ার হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি বলেছেন, ‘‌নিরস্ত্র বিক্ষোভকারীদের ওপর দমন-পীড়ন চালালে ইরানকে নরক দেখতে হবে।’

বৃহস্পতিবার রাত থেকে তেহরানসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভ তীব্র আকার ধারণ করে। ইরানের নির্বাসিত স্বঘোষিত ‘যুবরাজ’ রেজা পাহলভিও ইরানিদের রাস্তায় নেমে আসার আহ্বান জানান। ইন্টারনেট ও যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ থাকায় বিক্ষোভের প্রকৃতি ও মাত্রা এখনো স্পষ্ট নয়। তবে বিশ্লেষকদের মতে, এটি গত কয়েক বছরের মধ্যে ইরান সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জগুলোর একটি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যমের খবরে দাবি করা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের ‘সন্ত্রাসী এজেন্টরা’ অগ্নিসংযোগ ও সহিংসতা ছড়িয়েছে। রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম হতাহতের কথা স্বীকার করলেও বিস্তারিত জানায়নি।

ইরানের একটি মানবাধিকার সংস্থা জানিয়েছে, চলমান বিক্ষোভে এ পর্যন্ত অন্তত ৪৫ জন নিহত হয়েছেন। নরওয়েভিত্তিক পর্যবেক্ষণকারী সংস্থা ইরান হিউম্যান রাইটসও (আইএইচআর) বলছে, নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে অন্তত ৪৫ বিক্ষোভকারীর মৃত্যু হয়েছে, যার মধ্যে আট শিশুও রয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক হিউম্যান রাইটস অ্যাক্টিভিস্ট নিউজ এজেন্সি (এইচআরএএনএ) জানিয়েছে, পাঁচ শিশুসহ অন্তত ৩৪ বিক্ষোভকারী ও আট নিরাপত্তারক্ষী নিহত এবং ২ হাজার ২৭০ বিক্ষোভকারী গ্রেফতার হয়েছেন।

ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম জানিয়েছে, বিদেশী শক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকার অভিযোগে বেশ কয়েকজন ‘উসকানিদাতাকে’ গ্রেফতার ও বিপুল পরিমাণ চোরাচালান করা অস্ত্র জব্দ করা হয়েছে।

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশার কথা স্বীকার করলেও এ দাঙ্গা উসকে দেয়ার জন্য ‘বাইরের শক্তিকে’ দায়ী করেছেন।

উচ্চ মূল্যস্ফীতি ও মুদ্রার (রিয়াল) মান ব্যাপকভাবে হ্রাস পাওয়ার মতো অর্থনৈতিক সংকটের জেরে শুরু হওয়া এ আন্দোলনে রাস্তায় আগুন জ্বালানো, সরাসরি গুলি ও কাঁদানে গ্যাসের শেল ব্যবহারের চিত্র বিভিন্ন ভিডিওতে দেখা গেছে। বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী অস্ত্র ও কৌশল ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। তবে সরকারি কর্মকর্তাদের দাবি, দাঙ্গাকারীদের সঙ্গে সংঘর্ষের কারণেই কিছু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে।

গতকাল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক বার্তায় ট্রাম্প হুঁশিয়ারি দেন, ‘ইরান যদি শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের নিশানা করে, তবে সেখানে হস্তক্ষেপের জন্য যুক্তরাষ্ট্র সব দিক থেকে প্রস্তুত রয়েছে।’

এর আগে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর ঘটনায় ইরানকে ‘খুব কঠোরভাবে আঘাত’ করার হুমকি দিয়েছিলেন ট্রাম্প। নতুন ওই মন্তব্য তারই ধারাবাহিকতা বলে মনে করা হচ্ছে। গত বছর ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোয় মার্কিন হামলার পর ট্রাম্পের সাম্প্রতিক মন্তব্যগুলো বৃহত্তর সংঘাতের আশঙ্কা আরো বাড়িয়ে দিয়েছে।

ট্রাম্পের সর্বশেষ হুঁশিয়ারির বিপরীতে ইরান তার সামরিক বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রেখেছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোয় হামলার হুমকি দিয়েছে। তেহরান বলেছে, তারা পাল্টা জবাব দেয়ার ক্ষেত্রে কোনো সীমাবদ্ধতা রাখবে না এবং আগে হামলার শিকার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করবে না। তার নিরাপত্তা বা ভূখণ্ডে যেকোনো আঘাতকে ‘রেড লাইন’ বা চূড়ান্ত সীমা হিসেবে হুঁশিয়ারি দিয়েছে ইরান।

তেহরান আরো জানিয়েছে, যেকোনো হামলা বা অব্যাহত শত্রুতামূলক আচরণের বিপরীতে তারা চূড়ান্ত ও সিদ্ধান্তমূলক জবাব দেবে।

এদিকে ইরানে চলমান সরকারবিরোধী বিক্ষোভকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে খুশি করার চেষ্টা বলে মন্তব্য করেছেন দেশটির সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনি। গতকাল রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেয়া সংক্ষিপ্ত ভাষণে তিনি বলেন, ‘বিক্ষোভকারীরা অন্য দেশের প্রেসিডেন্টকে খুশি করতে নিজেরাই নিজেদের রাস্তা নষ্ট করছে।’

খামেনির ভাষণের সময় উপস্থিত জনতা ‘যুক্তরাষ্ট্রের ধ্বংস চাই’ বলে স্লোগান দেন। তিনি বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে ইঙ্গিত দেন।

গত ২৮ ডিসেম্বর দুর্বল অর্থনীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় নিয়ে শুরু হওয়া বিক্ষোভ ধীরে ধীরে দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। চলমান এ অস্থিরতা ইসলামি প্রজাতন্ত্রের ভিত্তিকেই চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।

এর আগে বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় ইরানের উত্তর-পূর্বের মাশহাদের একটি প্রধান সড়ক ধরে বিপুলসংখ্যক বিক্ষোভকারীর এগিয়ে যাওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আসে। ওই ভিডিওতে ‘শাহ জিন্দাবাদ’ ও ‘এটাই শেষ লড়াই, পাহলভি ফিরবেন’ স্লোগানও শোনা যায়। তেহরানের পূর্বাঞ্চলের একটি প্রধান সড়কজুড়ে বিশাল বিক্ষোভের আরেকটি ভিডিও অনলাইনে দেখা যায়। সেখানেও ‘এটাই শেষ লড়াই, পাহলভি ফিরবেন’—এমন স্লোগান শোনা যাচ্ছে। উত্তরের অন্যত্র নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষের পর বিক্ষোভকারীদের মুখে ‘লজ্জাজনক’, ‘ভয় পেয়ো না, আমরা সবাই একসঙ্গে আছি’ স্লোগান দিতে দেখা গেছে।

অন্য ভিডিওতে মধ্যাঞ্চলীয় শহর ইসফাহানে বিক্ষোভকারীদের ‘একনায়কের মৃত্যু’ স্লোগান দিতে শোনা যায়। উত্তরাঞ্চলীয় শহর বাবুলে স্লোগান হয়েছে ‘শাহ দীর্ঘজীবী হন’ এবং ‍উত্তর-পশ্চিমের শহর তাবরিজে হয়েছে ‘ভয় পেয়ো না, আমরা সবাই একসঙ্গে আছি’।

পরে এক্সে দেয়া পোস্টে রেজা পাহলভি বলেন, ‘লাখ লাখ ইরানি আজ (বৃহস্পতিবার) রাতে তাদের স্বাধীনতার দাবিতে বিক্ষোভ করেছে।’ তিনি বিক্ষোভকারীদের ‘সাহসী সহযোদ্ধা’ বলেও আখ্যা দেন।

পাহলভি ইরানি শাসকদের ‘চেপে ধরায়’ মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে ধন্যবাদ দেন এবং ইউরোপীয় নেতাদেরও একই কাজ করার আহ্বান জানান।

১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লবে রেজা পাহলভির বাবা যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত শাহ মোহাম্মদ রেজা পাহলভিকে ক্ষমতা থেকে উৎখাত করা হয়েছিল। রেজা পাহলভি এখন ওয়াশিংটন ডিসিতে নির্বাসিত জীবন কাটাচ্ছেন।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক

মোঃ ইউনুছ আলী

স্বত্ব © ২০২৫ মাতৃভূমির দৈনিক চিত্র

অনুসরণ করুন

যোগাযোগ : ৭১, পুস্প প্লাজা (চতুর্থ তলা), কারওয়ান বাজার, ঢাকা – ১২১৫।
ফোন : +৮৮ ০১৯২৯-৩৬৫২২৯। মেইল : dailychitro123@gmail.com

Design & Developed by : Rose IT BD