বাংলাদেশের বেসরকারি ব্যাংক খাতে শীর্ষ নির্বাহীদের পারিশ্রমিকের তালিকায় নতুন করে আলোচনায় এসেছেন সিটি ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মাসরুর আরেফিন। ২০২৫ অর্থবছরের নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদনভিত্তিক তথ্য অনুযায়ী, ব্যাংক খাতে সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া প্রধান নির্বাহী তিনি। বছরে তাঁর মোট পারিশ্রমিক প্রায় ৪ কোটি ৬৩ লাখ টাকা। মাসে গড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৩৮ লাখ ৬০ হাজার টাকা।
অঙ্কটা আরও সহজ করে দেখলে, মাসরুর আরেফিনের এক দিনের গড় পারিশ্রমিক প্রায় ১ লাখ ২৭ হাজার টাকা। অর্থাৎ কেবল পারিশ্রমিকের হিসাবেই এক দিনে যে অর্থ তাঁর প্রাপ্য, তা অনেক মানুষের কয়েক মাসের আয়ের সমান। তবে এই পুরো অঙ্ককে শুধু ‘বেতন’ হিসেবে দেখলে বিষয়টি অসম্পূর্ণ থেকে যায়। প্রকাশিত হিসাবের মধ্যে মূল বেতনের পাশাপাশি বাড়িভাড়া, বিভিন্ন ভাতা, উৎসব ও কর্মদক্ষতা বোনাস এবং প্রভিডেন্ট ফান্ডে ব্যাংকের অবদানও রয়েছে।
মাসরুর আরেফিনের এই অবস্থান অবশ্য একদিনে তৈরি হয়নি। তিন দশকের বেশি সময়ের ব্যাংকিং ক্যারিয়ারে দেশের ও আন্তর্জাতিক বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে কাজ করার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন তিনি। ১৯৯৫ সালে ANZ Grindlays Bank-এ Management Trainee হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন। পরবর্তী সময়ে ANZ Bank Melbourne, Standard Chartered Bank Qatar, Citibank N.A., American Express Bank, BRAC Bank এবং Eastern Bank-এ গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন।
২০১৯ সালে সিটি ব্যাংকের এমডি ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর ব্যাংকটির ব্যবসা ও মুনাফায় উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসে। তাঁর নেতৃত্বে ২০১৮ সালের ৬৯৯ কোটি টাকার অপারেটিং প্রফিট ২০২৪ সালে বেড়ে ২ হাজার ৩৫১ কোটি টাকায় পৌঁছায়। একই সময়ে ব্যাংকের নিট মুনাফা ২০২ কোটি টাকা থেকে বেড়ে ১ হাজার ৮৫ কোটি টাকা হয়। রিটার্ন অন ইকুইটি ৮ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৬ দশমিক ১ শতাংশে পৌঁছে।
এই সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০২৫ সালে আবারও তিন বছরের জন্য সিটি ব্যাংকের এমডি ও সিইও হিসেবে পুনর্নিয়োগ পান মাসরুর আরেফিন। ২০১৯ সাল থেকে টানা এই দায়িত্ব পালন করে আসছেন তিনি।
শুধু ব্যাংকার হিসেবেই নয়, মাসরুর আরেফিনের আরেকটি পরিচয়ও বেশ আলাদা। তিনি একজন লেখক ও অনুবাদক। ব্যাংকিংয়ের ব্যস্ত করপোরেট জগতের পাশাপাশি সাহিত্যচর্চায়ও নিজের জায়গা তৈরি করেছেন। তাঁর সাহিত্যকর্মের মধ্যে রয়েছে উপন্যাস ও অনুবাদ। অর্থনীতি ও করপোরেট জগতের কঠিন বাস্তবতার সঙ্গে সাহিত্যের জগৎকে একই জীবনে ধারণ করা তাঁর ব্যক্তিত্বকে করেছে আরও বৈচিত্র্যময়।
ব্যাংকিং খাতে তাঁর নেতৃত্বের স্বীকৃতিও এসেছে বিভিন্ন সময়ে। ২০২৫ সালে বাংলাদেশ C-Suite Awards-এর আর্থিক প্রতিষ্ঠান ক্যাটাগরিতে তিনি ‘CEO of the Year–2025’ পুরস্কার পান। তিন দশকের বেশি সময় ধরে দেশের আর্থিক খাতে অবদান এবং সিটি ব্যাংকে তাঁর নেতৃত্বের স্বীকৃতি হিসেবেই এই পুরস্কার দেওয়া হয়।
তবে সবচেয়ে বেশি পারিশ্রমিক পাওয়ার তথ্যটি শুধু ব্যক্তিগত আয়ের গল্প নয়; এটি বাংলাদেশের করপোরেট নেতৃত্বের বাজারমূল্য নিয়েও একটি গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত দেয়। দেশের ব্যাংকগুলোর আকার, ব্যবসার পরিধি, মুনাফা, নির্বাহীর অভিজ্ঞতা এবং পরিচালনা পর্ষদের পারিশ্রমিক নীতির ওপর শীর্ষ কর্মকর্তাদের পারিশ্রমিক নির্ভর করে। একই তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে থাকা ইস্টার্ন ব্যাংকের এমডি আলী রেজা ইফতেখার বছরে প্রায় ৩ কোটি ৫৮ লাখ টাকা এবং তৃতীয় অবস্থানে থাকা ডাচ্-বাংলা ব্যাংকের এমডি আবুল কাশেম মো. শিরিন প্রায় ৩ কোটি ২৪ লাখ টাকা পারিশ্রমিক পেয়েছেন।
অর্থাৎ, মাসরুর আরেফিনের বছরে প্রায় সাড়ে চার কোটি টাকার পারিশ্রমিক কেবল একটি বড় অঙ্ক নয়; এটি দেশের বেসরকারি ব্যাংকিং খাতে একজন শীর্ষ নির্বাহীর দায়িত্ব, অভিজ্ঞতা ও পারফরম্যান্সের বিনিময়ে তৈরি হওয়া করপোরেট মূল্যায়নেরও প্রতিফলন।
ব্যাংকার হিসেবে তিন দশকের পথ পেরিয়ে আজ তিনি বাংলাদেশের ব্যাংক খাতের সর্বোচ্চ পারিশ্রমিক পাওয়া শীর্ষ নির্বাহী। আর একই সঙ্গে সাহিত্যচর্চার মাধ্যমে তৈরি করেছেন সম্পূর্ণ ভিন্ন এক পরিচয়। করপোরেট বোর্ডরুম থেকে সাহিত্যের পৃষ্ঠা—মাসরুর আরেফিনের ক্যারিয়ার তাই শুধু অর্থের অঙ্কে নয়, বৈচিত্র্যেও আলাদা।









