তখন মধ্যরাত পেরিয়েছে, রাজধানী কারাকাসসহ ভেনিজুয়েলার নাগরিকরা গভীর ঘুমে। স্থানীয় সময় শুক্রবার দিবাগত রাত ২টা থেকে ৩টার মধ্যে রাজধানীর বিভিন্ন প্রান্তে আচমকা একের পর এক বিস্ফোরণ। এ ঘটনা ছিল ‘অপারেশন অ্যাবসোলুট রিজলভ’ নামে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর অভিযানের অংশ। এ সময় তাদের বিশেষায়িত ইউনিট ডেল্টা ফোর্স সুরক্ষিত সামরিক দুর্গসদৃশ বাসস্থান (মাদুরোর কারাকাস কম্পাউন্ড) থেকে ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে বন্দি করে। তাদেরকে পরবর্তী সময়ে নিউইয়র্কে নেয়া হয়েছে। নিজের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে বন্দি ভেনিজুয়েলার প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোর ছবিও প্রকাশ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
অভিযান শেষে গতকাল সংবাদ সম্মেলনে ট্রাম্প জানান, ভেনিজুয়েলা এখন কার্যত যুক্তরাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণে। আপাতত যুক্তরাষ্ট্রই চালাবে দেশটিকে। সেখানে যাবে মার্কিন তেল কোম্পানিগুলো, বিনিয়োগ করবে, ব্যবসা করবে। সমৃদ্ধ ভেনিজুয়েলা গড়ে তোলার ঘোষণাও দেন ট্রাম্প। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রের ভেনিজুয়েলা আক্রমণ এবং প্রেসিডেন্ট মাদুরোকে তুলে নেয়ার নিন্দা জানিয়েছে চীন, রাশিয়া, ইরান, কিউবা, মেক্সিকো, ব্রাজিলসহ অনেক দেশ।
২ ঘণ্টার ঝটিকা অভিযান ছিল অপারেশন অ্যাবসোলুট রিজলভ। অভিযান সমাপ্তির পর ট্রাম্প ঘোষণা দেন, ভেনিজুয়েলায় বড় সামরিক অভিযানের মাধ্যমে বামপন্থী প্রেসিডেন্ট নিকোলাস মাদুরোকে ক্ষমতাচ্যুত করা হয়েছে। মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেসকে কারাকাস থেকে বন্দি করে নিয়ে যাওয়া হয় মার্কিন জাহাজ ইউএসএস আইও জিমায়।
ভেনিজুয়েলায় তাদের অভিযানকে যুক্তরাষ্ট্রের ইতিহাসে কার্যকর এবং সামরিক ক্ষমতা ও দক্ষতার শক্তিশালী চমকপ্রদ প্রদর্শনী হিসেবে বর্ণনা করেছেন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। ফ্লোরিডায় সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্র শনিবার যা অর্জন করেছে, বিশ্বের আর কোনো দেশ তা করতে পারত না। খুব সংক্ষিপ্ত সময়ে এটা সম্ভব হয়েছে।
ট্রাম্প জানিয়েছেন, অভিযানে তাদের একজন সেনাও নিহত হননি। বহু হেলিকপ্টার, বিমান এবং অনেক মানুষ এ অভিযানে যুক্ত ছিল।
এদিকে ট্রাম্প ভেনিজুয়েলা চালানোর ঘোষণা দিলেও দেশটির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী দিওসদাদো কাবেয়ো এক টেলিভিশন ভাষণে দেশবাসীকে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন। একই সঙ্গে সরকারের নেতৃত্বের ওপর আস্থা রাখতে বলেছেন। অন্যদিকে অজ্ঞাত স্থান থেকে দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট ডেলসি রদ্রিগেস এক অডিও বার্তায় জানিয়েছেন, ভেনিজুয়েলায় মার্কিন আগ্রাসনের ঘটনা ঘটেছে। ট্রাম্প প্রশাসনের কাছে মাদুরো ও তার স্ত্রীর সন্ধান চেয়ে বিদেশী শত্রুদের প্রতিরোধের ঘোষণাও দেন তিনি।
ফক্স নিউজকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প জানিয়েছেন, ভেনিজুয়েলার বিরোধীদলীয় নেত্রী নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদোকে দেশটির নেতা হিসেবে সমর্থনের বিষয়টি তিনি খতিয়ে দেখছেন। বর্তমানে মাচাদো নরওয়েতে অবস্থান করছেন। বিশ্লেষকদের ধারণা, মাচাদোকে পশ্চিমা সমর্থিত বিকল্প নেতৃত্বের সম্ভাব্য মুখ হিসেবে দেখা হচ্ছে। তাকেই দেশটির নেতা হিসেবে বসানো হতে পারে। তবে মাচাদো তার এক্স হ্যান্ডলে ২০২৪ সালের নির্বাচনে ‘জনগণের ভোটে জেতা’ এদমুন্দো গঞ্জালেস উরুতিয়াকে অবিলম্বে প্রেসিডেন্ট পদে বসানোর দাবি জানিয়েছেন। নোবেলজয়ী মাচাদো লিখেছেন, ‘মাদুরো মধ্যস্থতায় যেতে চাননি, যা হওয়ার কথা ছিল তাই হয়েছে। স্বৈরশাসকের পতন ঘটেছে। পূর্ব প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী পদক্ষেপ নিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এবার ভেনিজ়ুয়েলায় শান্তি ফিরবে। আমরা ভেনিজ়ুয়েলায় শান্তি ফেরাব। রাজবন্দিদের মুক্তি দেয়া হবে। নির্বাসিতরা দেশে ফিরবেন।’ উরুতিয়া তার এক্স হ্যান্ডলে লিখেছেন, ‘ভেনিজুয়েলা এখন নির্ণায়ক মুহূর্তের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিরোধী পক্ষ দেশ পুনর্গঠনের জন্য প্রস্তুত।’
এদিকে কারাকাসে মার্কিন হামলার নিন্দায় সরব হয়েছে ভেনিজুয়েলার ঘনিষ্ঠ মিত্র হিসেবে পরিচিত রাশিয়া, চীন, কিউবা, ইরানসহ আরো কয়েকটি দেশ। তারা একে ভেনিজুয়েলার সার্বভৌমত্ব ও ভৌগোলিক অখণ্ডতার প্রকাশ্য লঙ্ঘন বলে উল্লেখ করেছেন। একই সঙ্গে হামলাকে জাতিসংঘ সনদবিরোধী পদক্ষেপ হিসেবে আখ্যা দিয়ে জরুরি ভিত্তিতে কূটনৈতিক সমাধানের আহ্বান জানানো হয়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ অন্যান্য পশ্চিমা রাষ্ট্রের নেতারা বলছেন, রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে মাদুরোর বৈধতা ছিল না। একই সঙ্গে তারা পরিস্থিতি শান্ত রাখার আহ্বান জানিয়ে সংকট সমাধানে আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের নীতিকে সম্মান দেখানোয় জোর দিয়েছেন।
যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তিন বাহিনীর সমন্বিত অভিযানে মাদুরোকে বন্দি করা হয়। গতকাল স্থানীয় সময় ভোরে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর ডেল্টা ফোর্স, নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনীর সদস্যরা সমন্বিত এ অভিযান পরিচালনা করেন। শুরুতেই স্থানীয় সময় রাত ২টা থেকে ৩টার মধ্যে রাজধানী কারাকাসজুড়ে বেশ কয়েকটি বিস্ফোরণ ঘটে। এ হামলাগুলো চালানো হয় ভেনিজুয়েলার সামরিক স্থাপনা বিশেষ করে বিমান ঘাঁটিগুলোতে, যাতে পাল্টা প্রতিরোধ না আসে। কারাকাসের ফুয়ের্তে তিউনা সামরিক ঘাঁটি, লা কার্লোটা এয়ারবেজ, এমনকি প্রয়াত প্রেসিডেন্ট হুগো শাভেজের সমাধি থাকা কুয়ের্তেল দে লা মনতানিয়ায়ও হামলা চালানো হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেয়া এক ভিডিও বিবৃতিতে ভেনিজুয়েলার প্রতিরক্ষামন্ত্রী ভ্লাদিমির পাদ্রিনো লোপেজ বলেন, ‘আগ্রাসী মার্কিন বাহিনী আমাদের মাটি অপবিত্র করেছে। তারা সামরিক হেলিকপ্টার থেকে ক্ষেপণাস্ত্র ও রকেট ছুড়ে বেসামরিক নাগরিক অধ্যুষিত আবাসিক এলাকায় আঘাত হেনেছে। ওয়াশিংটনের এ হামলা হীন ও কাপুরুষোচিত। কর্তৃপক্ষ এ হামলায় নিহত ও আহত ব্যক্তিদের তথ্য সংগ্রহ করছে।’
অপারেশনের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের জয়েন্ট চিফস অব স্টাফের চেয়ারম্যান জেনারেল ড্যান কেইন জানান, অ্যাবসোলুট রিজলভ নামের এ অভিযানের প্রস্তুতি চলছিল কয়েক মাস ধরে। শেষ পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নির্দেশে নির্ধারিত সময়সূচি অনুযায়ী অভিযানটি বাস্তবায়ন করা হয়। তিনি বলেন, ২ জানুয়ারি স্থানীয় সময় রাত ১০টা ৪৬ মিনিটে মাদুরোকে আটক করার জন্য সামরিক অভিযানের আনুষ্ঠানিক আদেশ দেন ট্রাম্প। এর আগে থেকেই বাহিনী মোতায়েন, গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ ও আকাশ প্রতিরক্ষা অক্ষম করার কৌশল নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনী প্রস্তুতি নিয়ে রেখেছিল।
তার বক্তব্য অনুযায়ী, মাদুরোকে আটক করতে আকাশপথে ১৫০টিরও বেশি বিমান মোতায়েন করে যুক্তরাষ্ট্র। এ বিমান বহরই রাজধানী কারাকাসের কেন্দ্রস্থলে মাদুরোর কম্পাউন্ডের দিকে অগ্রসর হওয়া বিশেষ বাহিনীকে নিরাপত্তা দেয়। অভিযানের শুরুতেই ভেনিজুয়েলার আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা নিষ্ক্রিয় করতে আকাশ থেকে হামলা চালানো হয় বলে জানান জেনারেল কেইন। তার দাবি, মার্কিন হামলায় ভেনিজুয়েলার বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ায় হেলিকপ্টারগুলো নিরাপদে টার্গেট এলাকায় পৌঁছানোর সুযোগ পায়। এ সময় একটি হেলিকপ্টার আঘাতপ্রাপ্ত হলেও তা উড়তে সক্ষম ছিল এবং মিশন থেকে ছিটকে যায়নি।
এরপর স্থানীয় সময় রাত ২টা ১ মিনিটে মাদুরোর কারাকাস কম্পাউন্ডে নামে অভিযান পরিচালনাকারী একটি দল। এ দলে ছিল মার্কিন আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্য এবং সামরিক বিশেষ বাহিনীর সদস্যরা। পরিকল্পনা অনুযায়ী তারা কম্পাউন্ড ঘেরাও করে ভেতরে প্রবেশ করে। কেইন আরো জানান, কম্পাউন্ড থেকে বের হওয়ার সময় মার্কিন বাহিনী গুলিবর্ষণের মুখে পড়ে এবং পাল্টা গুলি চালাতে হয়। তবে গোটা অভিযানে কোনো মার্কিন সেনা হতাহত হয়নি বলে দাবি করেন জয়েন্ট চিফসের চেয়ারম্যান।
অভিযানের শেষ ধাপ সম্পর্কে জেনারেল কেইন জানান, মাদুরোকে আটককারী মার্কিন বাহিনী ভেনিজুয়েলার সীমান্ত পেরিয়ে যায় ভোর ৪টা ২৯ মিনিটে । সেখান থেকে মাদুরোকে যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধজাহাজ ইউএসএস আইও জিমা-তে স্থানান্তর করা হয়। এখান থেকেই তাকে যুক্তরাষ্ট্রের মাটিতে আনা হয়েছে।
মার্কিন বিচার বিভাগ ঘোষণা দিয়েছে, মাদুরো ও তার স্ত্রী সিলিয়া ফ্লোরেস যুক্তরাষ্ট্রেই বিচারের মুখোমুখি হবেন। নিউইয়র্কের সাউদার্ন ডিস্ট্রিক্ট কোর্টে তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগ গঠন করা হয়েছে বলে জানিয়েছেন মার্কিন অ্যাটর্নি জেনারেল পাম বন্ডি। তাদের বিরুদ্ধে নার্কো সন্ত্রাসবাদের ষড়যন্ত্র, কোকেন আমদানি এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে মেশিনগান ও ধ্বংসাত্মক অস্ত্র ব্যবহারের ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে। এর আগে মাদুরোর বিরুদ্ধে ২০২০ সালে যুক্তরাষ্ট্রে দুর্নীতি, মাদক পাচারসহ বিভিন্ন অভিযোগে মামলা হয়েছিল। এসব মামলার সময় যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ঘোষণা দিয়েছিল, মাদুরোকে গ্রেফতার বা দোষী সাব্যস্ত করতে সহায়ক তথ্য দিলে ৫ কোটি ডলার পুরস্কার দেয়া হবে।









