প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী (উপদেষ্টা পদমর্যাদা) অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেছেন, ‘হ্যাঁ’-এর প্রার্থী আলাদা করে কেউ নন— ‘হ্যাঁ’ এর প্রার্থী আপনি, আমি, আমরা সবাই। কারণ ‘হ্যাঁ’ আমাদের উপহার দেবে একটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক বাংলাদেশ, যা জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মূল আকাঙ্ক্ষা।
বৃহস্পতিবার (২২ জানুয়ারি) খুলনা বিভাগীয় অডিটোরিয়ামে আসন্ন গণভোট ও ভোটার উদ্বুদ্ধকরণ উপলক্ষ্যে আয়োজিত এক মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন। সভায় সভাপতিত্ব করেন খুলনা বিভাগীয় কমিশনার মো. মোখতার আহমেদ।
অধ্যাপক আলী রীয়াজ বলেন, আসন্ন গণভোটে ‘হ্যাঁ’-তে সিল দিলে নতুন বাংলাদেশ গড়ার দ্বার উন্মুক্ত হবে। শুধু নিজে ভোট দিলেই হবে না; আপনার আশপাশের সবাইকে ‘হ্যাঁ’-তে ভোট দিতে উদ্বুদ্ধ করুন এবং ভোটকেন্দ্রে নিয়ে আসুন। এই গণভোটের মাধ্যমেই দেশ বদলে দেওয়ার সুযোগ এসেছে।
তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিবাদের যাঁতাকলে দীর্ঘদিন নিষ্পেষিত এ জাতি আর কোনো স্বৈরশাসন কিংবা দুঃশাসন চায় না। মানুষ চায় একটি আলোকিত আগামী, যেখানে থাকবে সাম্য, সমতা ও আনন্দ। যে বাংলাদেশে কোনো গুমের ভয় থাকবে না, গায়েবি মামলায় গ্রেফতারের আতঙ্ক থাকবে না। যে দিনের স্বপ্ন দেখেছিলেন আমাদের মহান মুক্তিযোদ্ধারা এবং যে দিনের জন্য জুলাই গণঅভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা অকাতরে জীবন দিয়েছে।
ড. আলী রীয়াজ বলেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান জাতির ইতিহাসে একটি অসাধারণ অর্জন। এই অভ্যুত্থান অপ্রত্যাশিতভাবে দেশকে গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠার একটি বড় সুযোগ এনে দিয়েছে। এই লক্ষ্য সামনে রেখে ইতোমধ্যে কিছু সংস্কার কার্যক্রম হাতে নেওয়া হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
তিনি আরও বলেন, বিদ্যমান উদ্যোগের পাশাপাশি আরও গভীর ও সুদূরপ্রসারী সংস্কার প্রয়োজন। এ কারণেই দেশের সব রাজনৈতিক দলের ঐকমত্যের ভিত্তিতে জুলাই সনদ প্রণয়ন করা হয়েছে। এই সনদ বাস্তবায়নের জন্য জনগণের সরাসরি সম্মতি প্রয়োজন, আর সে উদ্দেশ্যেই গণভোটের আয়োজন করা হয়েছে।
‘হ্যাঁ’ ভোটের অর্থ ও তাৎপর্য ব্যাখ্যা করে আলী রীয়াজ বলেন, এর মাধ্যমে তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও নির্বাচন কমিশন গঠনে সরকার ও বিরোধীদল একসঙ্গে কাজ করবে। ক্ষমতাসীনরা ইচ্ছামতো সংবিধান পরিবর্তন করতে পারবে না; গুরুত্বপূর্ণ সাংবিধানিক পরিবর্তনের জন্য জনগণের সম্মতি নিতে হবে। বিরোধী দল থেকে ডেপুটি স্পিকার ও গুরুত্বপূর্ণ সংসদীয় কমিটির সভাপতি নির্বাচিত হবেন। একজন ব্যক্তি সর্বোচ্চ ১০ বছরের বেশি প্রধানমন্ত্রী থাকতে পারবেন না। বিচারব্যবস্থা স্বাধীনভাবে কাজ করবে, ফলে বিচারের বাণী আর নীরবে-নিভৃতে কাঁদবে না।
সভায় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার বলেন, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ জয়ী হলে ফ্যাসিবাদের পথ চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে— যে পথ সংবিধানের দুর্বলতার সুযোগে তৈরি হয়েছিল।
তিনি আরও বলেন, গণভোটের মধ্য দিয়ে আমাদের পূর্বসূরীদের পুরোনো স্বপ্ন বাস্তবায়নের সুযোগ এসেছে। ৫৪ বছর আগে মেহেরপুরের বৈদ্যনাথতলায় স্বাধীন দেশের যে স্বপ্নে শপথ নেওয়া হয়েছিল, সেই স্বপ্ন ছিল সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচারের ভিত্তিতে একটি নতুন রাষ্ট্র গড়ে তোলা— যেখানে কোনো বৈষম্য, বঞ্চনা ও শোষণ থাকবে না।

মনির হায়দার অর্থনৈতিক লুটপাটের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরে বলেন, ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের নেতৃত্বে গঠিত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে— গত ১৬ বছরে দেশ থেকে প্রায় সোয়া দুই লাখ কোটি টাকা পাচার হয়েছে। এ অর্থ এ দেশের মানুষের, যা দিয়ে দেশের উন্নয়ন করা সম্ভব ছিল। লুটেরাদের এই লুটপাট বন্ধ করতেই ‘হ্যাঁ’-তে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানাই।
অনুষ্ঠানে আরও বক্তব্য দেন খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক মাকসুদ হেলালী, খুলনা রেঞ্জের ডিআইজি মো. রেজাউল হকসহ অন্যান্য অতিথিরা।
মতবিনিময় সভায় খুলনা বিভাগের ১০ জেলার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ বিভিন্ন পর্যায়ের ঊর্ধ্বতন সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।









