সোমবার | ১৮ মে, ২০২৬ | ৪ জ্যৈষ্ঠ, ১৪৩৩

পাঁচ স্তম্ভের উন্নয়ন কৌশলে এগোচ্ছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপি

স্টাফ রিপোর্টার

রাষ্ট্র সংস্কার, বৈষম্যহীন উন্নয়ন, অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার, আঞ্চলিক ভারসাম্য এবং সামাজিক সংহতিকে ভিত্তি করে পাঁচ স্তম্ভের উন্নয়ন কৌশলে সাজানো হয়েছে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি (এডিপি)। প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকার এই উন্নয়ন পরিকল্পনাকে সরকার দেশের দীর্ঘমেয়াদি সংস্কার ও টেকসই উন্নয়ন যাত্রার নতুন দৃষ্টিভঙ্গি হিসেবে তুলে ধরেছে। সরকার বলছে, শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, বরং প্রশাসনিক দক্ষতা, মানবসম্পদ উন্নয়ন, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গড়ে তোলাই হবে নতুন এডিপির মূল লক্ষ্য।

সোমবার (১৮ মে) রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের এনইসি সম্মেলন কক্ষে অনুষ্ঠিত জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের (এনইসি) সভায় ২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপি অনুমোদন দেওয়া হয়। সভায় সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী ও এনইসি চেয়ারপারসন তারেক রহমান। এতে সরকারের মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী ও সচিবরা উপস্থিত ছিলেন।

একই সঙ্গে আগামী পাঁচ বছরের জন্য কৌশলগত আর্থিক পরিকল্পনার কাঠামোতেও নীতিগত অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগের (জিইডি) অধীনে একটি উপদেষ্টা কমিটি এই কাঠামো প্রস্তুত করছে।

সভা সূত্রে জানা গেছে, অনুমোদিত এডিপির মোট আকার ধরা হয়েছে প্রায় ৩ লাখ কোটি টাকা। এর মধ্যে সরকারি অর্থায়ন ১ লাখ ৯০ হাজার কোটি টাকা এবং বৈদেশিক ঋণ ও অনুদান থেকে ১ লাখ ১০ হাজার কোটি টাকা সংগ্রহের পরিকল্পনা রয়েছে। চলমান অর্থবছরের তুলনায় এটি বড় আকারের উন্নয়ন কর্মসূচি, যা সরকারের বিনিয়োগ সক্ষমতা ও উন্নয়ন কার্যক্রম সম্প্রসারণের ইঙ্গিত বহন করছে।

এডিপিতে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগ থেকে ১ হাজার ২৭৭টি নতুন প্রকল্প সুপারিশ করা হয়েছে। পাশাপাশি সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় ৮০টি এবং বাংলাদেশ ক্লাইমেট চেঞ্জ ট্রাস্ট ফান্ডের আওতায় ১৪৮টি প্রকল্প অন্তর্ভুক্ত করার প্রস্তাব রাখা হয়েছে। এতে জলবায়ু অভিযোজন, বেসরকারি বিনিয়োগ এবং দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনার প্রতি সরকারের গুরুত্ব স্পষ্ট হয়েছে।

২০২৬-২৭ অর্থবছরের এডিপিতে প্রকল্প বাস্তবায়নের গতি বৃদ্ধি ও আর্থিক শৃঙ্খলার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। চলমান অর্থবছরে প্রকল্প ব্যয়ের বাস্তবায়ন হার বৃদ্ধি পাওয়াকে ইতিবাচক অগ্রগতি হিসেবে দেখছে সরকার। একই সঙ্গে জুন ২০২৭ সালের মধ্যে শেষ করা সম্ভব এমন প্রকল্প দ্রুত সম্পন্ন করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। মেয়াদোত্তীর্ণ প্রকল্পে নতুন ব্যয় সীমিত রাখার সিদ্ধান্তও নেওয়া হয়েছে, যাতে উন্নয়ন ব্যয় আরও কার্যকর ও জবাবদিহিমূলক হয়।

এডিপির আওতায় ১৫টি খাতের মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ, সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগ এবং মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগ সর্বোচ্চ বরাদ্দপ্রাপ্ত খাত হিসেবে স্থান পেয়েছে। এছাড়া দরিদ্র ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর সুরক্ষায় সামাজিক উন্নয়ন সহায়তা খাতে ১৭ হাজার কোটি টাকার বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে।

সরকারের ঘোষিত ‘ফাইভ ইয়ার স্ট্র্যাটেজিক ফ্রেমওয়ার্ক ফর রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট’র আলোকে পুরো এডিপিকে পাঁচটি প্রধান স্তম্ভে বিন্যস্ত করা হয়েছে।

রাষ্ট্রব্যবস্থার সংস্কার

এ বিচার ও আইনগত সেবা সম্প্রসারণ, প্রশাসনিক ডিজিটালাইজেশন, আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সরকারি বিনিয়োগ ব্যবস্থাপনার আধুনিকীকরণের ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে মাল্টি-ইয়ার পাবলিক ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম চালুর পরিকল্পনাও নেওয়া হয়েছে, যা দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়ন পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সহায়ক হবে বলে মনে করছে সরকার।

বৈষম্যহীন আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন

এ শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, কারিগরি শিক্ষা, দক্ষ জনশক্তি তৈরি এবং সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বড় বরাদ্দের মাধ্যমে দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলা এবং সার্বজনীন স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

ভঙ্গুর অর্থনীতির পুনর্গঠন ও পুনরুদ্ধার

এ জ্বালানি নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, পরিবহন অবকাঠামো, শিল্পায়ন এবং অর্থনৈতিক অঞ্চল গঠনের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান সৃষ্টিকে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের মূল ভিত্তি হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে।

অঞ্চলভিত্তিক সুষম উন্নয়ন

এ উত্তরাঞ্চল, উপকূলীয় এলাকা, পার্বত্য অঞ্চল এবং বন্দরকেন্দ্রিক উন্নয়ন কার্যক্রমকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে। চট্টগ্রাম ও মোংলাকে লজিস্টিক হাব হিসেবে গড়ে তোলা এবং উপকূলীয় সুরক্ষা অবকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনাও এতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।

ধর্ম, সমাজ, ক্রীড়া, সংস্কৃতি ও সংহতি

এতে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখা, সংস্কৃতির বিকাশ, যুবসমাজের দক্ষতা উন্নয়ন এবং ক্রীড়া অবকাঠামো সম্প্রসারণের বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। সরকার মনে করছে, উন্নয়নের পাশাপাশি সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ভিত্তি শক্তিশালী না হলে দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক

মোঃ ইউনুছ আলী

স্বত্ব © ২০২৫ মাতৃভূমির দৈনিক চিত্র

অনুসরণ করুন

যোগাযোগ : ৭১, পুস্প প্লাজা (চতুর্থ তলা), কারওয়ান বাজার, ঢাকা – ১২১৫।
ফোন : +৮৮ ০১৯২৯-৩৬৫২২৯। মেইল : dailychitro123@gmail.com

Design & Developed by : Rose IT BD