শুক্রবার | ২ অক্টোবর, ২০২৬ | ১৭ আশ্বিন, ১৪৩৩

মানবাধিকার রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচার থেকে সুরক্ষা দেয়: কাদের গনি চৌধুরী

স্টাফ রিপোর্টার

বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) মহাসচিব কাদের গনি চৌধুরী বলেছেন, মানবাধিকার রাষ্ট্রীয় স্বৈরাচার থেকে সুরক্ষা দেয়। সমাজের সব স্তরে সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করে মানবাধিকার।

আজ বুধবার (৫ নভেম্বর) বিকেলে ঢাকার একটি কনভেনশন হলে মানবাধিকার খবর আয়োজিত ‘মানবিক মানুষ সম্মাননা-২০২৫’ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন তিনি।

মানবাধিকার খবর সম্পাদক রিয়াজ উদ্দিনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে অন্যদের মধ্যে সাবেক সচিব মার্গুব মোর্শেদ, মানবাধিকার সংগঠক রেজোয়ানা বাশার ও নাসরিন হেলালী বক্তব্য দেন।

মানবাধিকার মানুষের সুস্থ, সুন্দর ও শান্তিপূর্ণভাবে বেঁচে থাকার অধিকার দেয়- এ কথা উল্লেখ করে কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘সমাজের সব স্তরে সমতা ও ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার ভিত্তি স্থাপন করে মানবাধিকার। এটি নিশ্চিত করে যে আইনের চোখে সবাই সমান। জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বা অন্য কোনো পরিচয়-নির্বিশেষে সব মানুষের জীবন, স্বাধীনতা, এবং মর্যাদার অধিকার সুরক্ষিত করে মানবাধিকার।’

কিন্তু ‘বিগত ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৬ বছর পদে পদে মানবাধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে’ বলে বর্ণনা করেন কাদের গনি চৌধুরী। বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, ‘সোনার বাংলাকে পরিণত করা হয়েছিল মৃত্যু উপত্যকায়। ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনার ভয়ংকর সময়ে দেশের মানুষ ছিল অধিকারহারা। দেশে গণতন্ত্র ও মানবাধিকার ছিল না। আইনের শাসন ও ন্যায়বিচার ছিল না। ভোটাধিকার ছিল না। বাকস্বাধীনতা ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতা ছিল না। ছিল না স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি।’

পেশাজীবী ও বুদ্ধিজীবীরাও শেখ হাসিনার নিষ্ঠুর শাসন থেকে রেহাই পাননি বলে মন্তব্য করে বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, ‘সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি, একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক আফতাব আহমদ, সাংবাদিক ফরহাদ খাঁ দম্পতি, অ্যাডভোকেট এইউ আহমদ, ব্যাংকার বিএম সাকের হোসাইনসহ অসংখ্য পেশাজীবীকে হত্যা করা হয়। শেখ হাসিনার ১৬ বছরে জীবন দিতে হয় ৬৮ জন সাংবাদিককে। পিলখানায় হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে ৫৭ জন দেশপ্রেমিক সেনা কর্মকর্তাকে হত্যা করা হয়।’

এ সময় শাপলা চত্বরে রাতের আঁধারে আলেমদের ওপর তখনকার সরকারি বাহিনীর হামলার কথা তুলে ধরেন কাদের গণি চৌধুরী। তিনি বলেন, সেই রাতে ব্রাশফায়ারে অনেক আলেমকে হত্যা করা হয়।

সাংবাদিকদের এই শীর্ষস্থানীয় নেতা বলেন, ‘গুম-খুন ছিল নিত্যদিনের ঘটনা। চিকিৎসক, প্রকৌশলী, আইনজীবী, মানবাধিকার কর্মী, কৃষিবিদ, শিক্ষক, ব্যাংকার থেকে শুরু করে সাংস্কৃতিক কর্মী কেউ রেহাই পায়নি নিষ্ঠুরতা থেকে। চাকরি, পদোন্নতি হতো দলীয় বিবেচনায়। ভিন্নমতের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শাস্তিমূলক বদলি, পদোন্নতি বঞ্চিত ও চাকরিচ্যুতি ছিল নিত্যঘটনা। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই এবং র‍্যাবের গোপন টর্চার সেল আয়নাঘর তৈরি করে সেখানে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর চালানো হতো বর্বর নির্যাতন।’

এমনই পরিস্থিতিতে বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছাত্ররা তীব্র আন্দোলন গড়ে তোলে। তাদের পক্ষে এসে দাঁড়ায় পেশাজীবী-জনতা। রাজপথে নেমে আসেন অভিভাবক ও রাজনৈতিক কর্মীরাও। জুলাই আন্দোলনের বর্ণনা দিয়ে কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘হাসিনার কাছ থেকে গুলি চালানোর নির্দেশ এল। পুলিশ, র‍্যাব ও বিজিবি, ছাত্রলীগ, যুবলীগ নির্বিচারে গুলি চালাল ছাত্রদের বুকে। সারি সারি লাশ পড়ল রাস্তায়। কিন্তু দমানো গেল না ছাত্রদের।’

বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, ‘দাসত্বের শৃঙ্খল ভাঙার এক অভাবনীয় গণঅভ্যুত্থান দেখল বাংলাদেশ। দেড় যুগ ধরে নিপীড়িত মানুষের ক্ষোভের বারুদ বিস্ফোরিত হলো চব্বিশের জুলাই-আগস্টে। পালিয়ে যেতে বাধ্য হয় ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা।’

নতুন সময়ে কাঙ্ক্ষিত বাংলাদেশের বর্ণনা দিতে গিয়ে সাংবাদিকদের এ নেতা বলেন, ‘আমরা চাই এমন একটি দেশ যেখানে দুর্নীতি, হানাহানি, গুম-খুন, রাহাজানি, ক্রসফায়ার, ধর্ষণ থাকবে না। নাগরিক নির্যাতনের জন্য থাকবে না আয়নাঘর। থাকবে না বৈষম্য, দারিদ্র্য, বেকারত্ব, বাজার সিন্ডিকেট, ক্ষমতার অপব্যবহার। থাকবে না মব জাস্টিস। আমরা একটা কল্যাণমূলক রাষ্ট্র চাই, যেখানে সব নাগরিক সমঅধিকার ভোগ করবেন।’

‘আমরা নীতিভিত্তিক রাষ্ট্র চাই, নেতাভিত্তিক নয়। যে রাজনৈতিক দলই ক্ষমতায় আসুক না কেন তাদের জনগণের প্রতি দায়বদ্ধ থাকতে হবে। এক ব্যক্তির ইচ্ছায় নয়, জনগণের ইচ্ছায় দেশ পরিচালিত হবে। আমরা চাই জনগণই ভোট দিয়ে রাষ্ট্র পরিচালনায় তাদের প্রতিনিধি নির্বাচন করবে।’ যোগ করেন কাদের গনি চৌধুরী।

স্বপ্নের বাংলাদেশ থেকে সব ধরনের দুর্নীতির অবসান চান কাদের গনি চৌধুরী। বলেন, ‘নতুন বাংলাদেশকে আমরা স্বাবলম্বী দেখতে চাই। সমাজ ও রাষ্ট্রের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ঢুকে পড়া দুর্নীতির অবসান চাই। একটা শোষণমুক্ত সমাজ চাই। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত প্রশাসন চাই। আমরা সর্বত্র ন্যায়বিচার ও আইনের শাসন চাই। আমরা আর কোনো বিচারপতির মুখে শুনতে চাই না ‘ট্রুথ ইজ নো ডিফেন্স’।’

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীতে ব্যাপক সংস্কার দরকার বলে মন্তব্য করে বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, এ বাহিনী যেন রাজনৈতিক দলের আজ্ঞাবহ বা দলীয় ঠেঙ্গাড়ে বাহিনীতে পরিণত না হয়।

সরকারের ভূমিকা প্রসঙ্গে কাদের গনি চৌধুরী বলেন, ‘সরকার হবে নমনীয়, প্রয়োজনমতো কঠোরতা ও মানবিকতা প্রদর্শন করবে। বিরোধী দলকে শোষণ না করে সরকারের মূল লক্ষ্য হবে রাষ্ট্রের উন্নয়ন। একটি শক্তিশালী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক সংবিধানের মাধ্যমে জাতি, ধর্ম, লিঙ্গ বা অর্থনৈতিক অবস্থার ভিত্তিতে বৈষম্য দূর হবে। বিনা খরচে মানসম্মত শিক্ষা ও সহজলভ্য স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত হবে। গণতান্ত্রিক রাজনীতিতে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠা এবং জনগণের কল্যাণে কাজ করার প্রতিশ্রুতি থাকবে। আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে শান্তিপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক নীতি থাকবে। আমরা আর কোনো নতজানু পররাষ্ট্রনীতি দেখতে চাই না।’

নারী অধিকার নিয়েও কথা বলেন বিএফইউজে নেতা, ‘নারীদের জন্য চাই মায়ার চাদরে ঘেরা অকৃত্রিম প্রেমের বাংলাদেশ। যেখানে আর লজ্জিত ও লাঞ্ছিত হবে না একজন মা- বোন। ঘরে বাইরে, চাকরিস্থলে তারা নিরাপদ থাকবেন।’

বিএফইউজে মহাসচিব বলেন, ‘আজ আমাদের সবচেয়ে বড় দরকার নিজেকে পাল্টানো। সততা, দেশপ্রেম, নৈতিকতা, শৃঙ্খলা আর ভালোবাসার মানদণ্ডে এগিয়ে থাকতে হবে প্রতিটি নাগরিককে। ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি মব জাস্টিস আর অন্যায়কে ‘না’ বলার সাহস থাকতে হবে সবার। নিজেকে পরিবর্তন করতে পারলেই সামগ্রিক পরিবর্তন সহজ হবে।’

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক

মোঃ ইউনুছ আলী

স্বত্ব © ২০২৫ মাতৃভূমির দৈনিক চিত্র

অনুসরণ করুন

যোগাযোগ : ৭১, পুস্প প্লাজা (চতুর্থ তলা), কারওয়ান বাজার, ঢাকা – ১২১৫।
ফোন : +৮৮ ০১৯২৯-৩৬৫২২৯। মেইল : dailychitro123@gmail.com

Design & Developed by : Rose IT BD