জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় রাজধানীর রামপুরায় নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশে ঝুলে থাকা তরুণকে গুলি ও দুজনকে হত্যার ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় সাবেক ডিএমপি কমিশনার হাবিবসহ ৩ পুলিশের মৃত্যুদণ্ডের রায়ের পূর্ণাঙ্গ অনুলিপি প্রকাশ করেছেন ট্রাইব্যুনাল। সেই সঙ্গে একজনকে দেওয়া যাবজ্জীবন কারাদণ্ড ও আসামির ২০ বছরের কারাদণ্ডের বিষয়টিও রায়ে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিচারপতি মো. গোলাম মর্তুজা মজুমদারের নেতৃত্বাধীন ৩ সদস্যের আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-১ এর তিন বিচারকের সাক্ষরের পর বুধবার (১৫ জুলাই) রায়টি প্রকাশিত হয়। ফলে বুধবার থেকে আগামী এক মাসের মধ্যে আপিল করতে পারবেন সাজাপ্রাপ্তরা।
গত ২৮শে জুন মানবতাবিরোধী অপরাধের এ মামলায় সাবেক ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ৩ জনের মৃত্যুদণ্ড, একজনের যাবজ্জীবন, এএসআই চঞ্চলের ২০ বছর কারাদণ্ড দেয় ট্রাইব্যুনাল।
রায়ে ট্রাইব্যুনাল উল্লেখ করেন, ২০২৪ সালের ১ জুলাই শুরু হওয়া কোটা সংস্কার আন্দোলন ৫ আগস্ট পর্যন্ত চলতে থাকে। ১৪ জুলাই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এক সংবাদ সম্মেলনের বক্তব্যের পর আন্দোলন আরও তীব্র হয়। পরদিন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের বক্তব্যও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ক্ষোভ বাড়িয়ে তোলে।
এরপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আওয়ামী লীগ ও ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের হামলার পর আন্দোলন দেশব্যাপী ছড়িয়ে পড়ে। ট্রাইব্যুনালের পর্যবেক্ষণে বলা হয়, আন্দোলন দমনে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর পাশাপাশি আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ ও স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতাকর্মীরা অংশ নেয়।
রায়ে আরও বলা হয়, উপস্থাপিত টেলিফোন আলাপের তথ্য থেকে প্রতীয়মান হয় যে, তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী আন্দোলন দমনে প্রাণঘাতী অস্ত্র, ড্রোন ও হেলিকপ্টার ব্যবহারের নির্দেশ দেন। একই নির্দেশের আলোকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামালের বাসভবনে অনুষ্ঠিত একটি বৈঠকে একটি ‘কোর কমিটি’ আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়। ওই কমিটিতে তৎকালীন আইজিপি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন, ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ অন্যরা উপস্থিত ছিলেন।
ট্রাইব্যুনাল বলেন, ওই সিদ্ধান্তের পর ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান ওয়্যারলেস বার্তায় অধস্তন পুলিশ সদস্যদের আন্দোলন দমনে সর্বোচ্চ শক্তি প্রয়োগের নির্দেশ দেন।
রায়ে উল্লেখ করা হয়, ১৯শে জুলাই জুমার নামাজের পর বনশ্রী মসজিদের সামনে গুলিতে নিহত হন নাদিম। একই দিন নিজ বাড়ির কোলাপসিবল গেটের ভেতরে গুলিবিদ্ধ হয়ে নিহত হন মায়া ইসলাম। এ ছাড়া বনশ্রীতে নিজ বাড়ির গেটের ভেতরেই গুলিবিদ্ধ হয়ে গুরুতর আহত হয় শিশু বাসিত খান মূসা। আর পুলিশের ধাওয়া থেকে বাঁচতে একটি নির্মাণাধীন ভবনের কার্নিশের রড আঁকড়ে ধরে থাকা অবস্থায় গুলিবিদ্ধ হন আমির হোসেন।
ট্রাইব্যুনাল আরও বলেন, রামপুরা-বনশ্রী এলাকায় এসব ঘটনার পর তৎকালীন ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান রামপুরা থানায় গিয়ে তৎকালীন ওসি মশিউর রহমানকে এক লাখ টাকা পুরস্কার দেন। ঘটনাস্থলে উপস্থিত থেকে অভিযানের তদারকি করেন খিলগাঁও জোনের অতিরিক্ত উপ-পুলিশ কমিশনার (এডিসি) রাশেদুল ইসলাম। আর রামপুরা থানার ওসি মশিউর রহমান নিজে গুলি চালানোর পাশাপাশি পুরো অভিযান পরিচালনা করেন।
রায়ে বলা হয়, আমির হোসেন নির্মাণাধীন ভবনে আশ্রয় নেওয়ার পর এসআই তারিকুল ইসলাম ও এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার তাকে লক্ষ্য করে একাধিকবার গুলি করেন। এ ঘটনার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে।
ট্রাইব্যুনাল তার সিদ্ধান্তে বলেন, এসব কর্মকাণ্ড আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইন, ১৯৭৩-এর ৩ ও ৪ ধারা এবং রোম সংবিধির ৭ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী মানবতাবিরোধী অপরাধ। রায়ে পলাতক ডিএমপি কমিশনার হাবিবুর রহমান, পলাতক এডিসি রাশেদুল ইসলাম এবং পলাতক ওসি মশিউর রহমানকে নাদিম ও মায়া ইসলামকে হত্যা এবং বাসিত খান মূসা ও আমির হোসেনকে গুরুতর আহত করার তিনটি অভিযোগেই দোষী সাব্যস্ত করা হয়।
অন্যদিকে এসআই তারিকুল ইসলাম এবং এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারকে শুধু আমির হোসেনকে গুলিবিদ্ধ করে গুরুতর আহত করার অভিযোগে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে।
সাজা প্রসঙ্গে ট্রাইব্যুনাল বলেন, মানবতাবিরোধী অপরাধের প্রতিটি অভিযোগে সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ড অথবা ট্রাইব্যুনালের বিবেচনায় উপযুক্ত অন্য কোনো দণ্ড হতে পারে। অপরাধের ভয়াবহতা বিবেচনায় হাবিবুর রহমান, রাশেদুল ইসলাম ও মশিউর রহমান সর্বোচ্চ শাস্তির যোগ্য হলেও তিনটি অভিযোগের জন্য প্রত্যেককে একটি করে একক সাজা দেওয়া সমীচীন বলে ট্রাইব্যুনাল মনে করেন।
অন্যদিকে এসআই তারিকুল ইসলাম ও এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকারের ক্ষেত্রে তারা পুলিশ বাহিনীর নিম্নস্তরের কর্মকর্তা এবং ভুক্তভোগী আমির হোসেন গুলিবিদ্ধ হলেও বেঁচে যাওয়ায় তুলনামূলক লঘু শাস্তি প্রাপ্য বলে ট্রাইব্যুনাল পর্যবেক্ষণ করেন। এ ছাড়া এএসআই চঞ্চল চন্দ্র সরকার পলাতক না হয়ে বিচার মোকাবিলা করেছেন এবং দীর্ঘ সময় কারাগারে ছিলেন এ বিষয়টিও সাজা নির্ধারণে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে।









