শনিবার | ৩ অক্টোবর, ২০২৬ | ১৮ আশ্বিন, ১৪৩৩

জুলাই সনদ বাস্তবায়ন হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথগুলো চিরতরে বন্ধ হবে : প্রধান উপদেষ্টা

স্টাফ রিপোর্টার

অন্তর্বর্তী সরকারের সবচেয়ে বড় অর্জন জুলাই সনদ, যার ভিত্তিতে গণভোটে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতায় দেশের মানুষ তা বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত দিয়েছে বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, জুলাই সনদের বাস্তবায়ন হলে ফ্যাসিবাদ ফিরে আসার পথগুলো চিরতরে বন্ধ হয়ে যাবে। আশা করব এটা নির্ধারিত সময়সীমার মধ্যে বাস্তবায়ন হবে। অন্তর্বর্তী সরকারের ছোট-বড় ভালোমন্দ অনেক কথা ভুলে গেলেও জুলাই সনদের কথা জাতি কখনো ভুলবে না। এই সনদ রচনা এবং গণভোটে পাশ করানোর জন্য আমি সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক সংগঠন, অধিকার রক্ষা প্রতিষ্ঠান যারা অক্লান্ত পরিশ্রম করেছে তাদের সবাইকে আজ অভিনন্দন জানাচ্ছি।

সোমবার (১৬ ফেব্রুয়ারি) রাতে জাতির উদ্দেশে ভাষণে মুহাম্মদ ইউনূস এসব কথা বলেন।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের সময় দেয়ালে দেয়ালে তরুণরা যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন এঁকেছিল—তার কেন্দ্র ছিল প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার। সেই প্রত্যাশা বাস্তবায়নে অন্তর্বর্তী সরকার প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন করেছে এবং প্রায় ৬০০টি নির্বাহী আদেশ জারি করেছে, যার প্রায় ৮৪ শতাংশ ইতোমধ্যে বাস্তবায়িত হয়েছে। এই সংস্কারগুলো নাগরিক অধিকারকে সংহত করেছে, বিচারব্যবস্থাকে শক্তিশালী করেছে এবং গুম, খুন ও বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি যেন আর কখনো ফিরে না আসে সেটা নিশ্চিত করেছে।

তিনি বলেন, আমরা দায়িত্ব গ্রহণের সময় দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ছিল অত্যন্ত ভঙ্গুর। থানাগুলো ছিল পুলিশ শূন্য, জনগণের মধ্যে আস্থার বদলে ভয় ও শঙ্কা তৈরি হয়েছিল। ধাপে ধাপে আমরা সেই অবস্থার পরিবর্তন ঘটিয়েছি। আজ পুলিশ আর মারণাস্ত্র ব্যবহার করে না, বেআইনিভাবে কাউকে তুলে নিয়ে যায় না, ‘বন্দুকযুদ্ধের’ নামে হত্যা করে না, পুলিশ ও গোয়েন্দা বাহিনীর ভয়ে কাউকে ডিলিট বাটন চাপতে হয় না। জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক বাহিনী হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে পুলিশ কমিশন অধ্যাদেশ ২০২৫ প্রণয়ন করা হয়েছে। বিচার বিভাগকে স্বাধীন ও শক্তিশালী করতে পৃথক সচিবালয় গঠন, বিচারক নিয়োগে স্বচ্ছ কাঠামো এবং দেওয়ানি ও ফৌজদারি আইনে যুগান্তকারী সংস্কার করা হয়েছে। সেপারেশন অব জুডিশিয়ারির জন্য মাজদার হোসেন মামলার রায় আমরা বাস্তবায়ন করে গেলাম।

‘গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন করা হয়েছে। বিচার প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ করতে রায় সরাসরি সম্প্রচারের সুযোগ, বিদেশি আইনজীবী নিয়োগ এবং অন্তর্বর্তী আপিলের বিধান যুক্ত করা হয়েছে। বাংলাদেশ যেন আর কখনো মানবাধিকারহীন রাষ্ট্রে পরিণত না হয়—সে লক্ষ্যে জাতীয় মানবাধিকার কমিশন অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে এবং কমিশন গঠন করা হয়েছে।’

মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, একটি সমাজ তখনই উন্নত হয়, যখন তার নারীরা নিরাপদ, সম্মানিত ও সমান অধিকারপ্রাপ্ত হন। উন্নয়ন তখনই টেকসই হয়, যখন নারীরা সিদ্ধান্ত গ্রহণে, অর্থনীতিতে, শিক্ষায় ও নেতৃত্বে সমানভাবে অংশ নিতে পারেন। যে নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন আমরা দেখছি নারীদের অগ্রযাত্রা ছাড়া তা গড়ে তোলা সম্ভব নয়। নারী ও শিশুর সুরক্ষায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধ অধ্যাদেশ, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ অধ্যাদেশ এবং নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন সংশোধন করা হয়েছে। নতুন এসব আইনের মাধ্যমে কর্মক্ষেত্রে ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নারীদের হয়রানি প্রতিরোধ ও সুরক্ষা নিশ্চিত করার পথ সুগম করা হয়েছে।

‘অভ্যুত্থান–পরবর্তী এক উত্তাল সময়ে দেশকে ধীরে ধীরে স্বাভাবিক ধারায় ফিরিয়ে আনতে আমাদের সশস্ত্র বাহিনীর সৈন্যরা যে ধৈর্য, পেশাদারিত্ব ও দায়িত্ববোধের পরিচয় দিয়েছেন, তার জন্য দেশবাসীর পক্ষ থেকে আমি তাদের প্রত্যেককে আন্তরিক ধন্যবাদ জানাচ্ছি। একইসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে চাই—যখনই কোনো সংকটময় পরিস্থিতির উদ্ভব হয়েছে, তখনই দেশের রাজনৈতিক নেতৃত্ব আমাদের আহ্বানে তাৎক্ষণিকভাবে সাড়া দিয়েছেন এবং সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিয়েছেন। এই পারস্পরিক দায়িত্ববোধ ও সংযমই দেশকে অস্থিরতার পথ থেকে স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হয়েছে।

তিনি বলেন, স্বৈরাচারের ১৬ বছরে এ দেশের রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা যে ভয়াবহ নিপীড়ন, মামলা–হামলা, গুম ও হত্যার শিকার হয়েছেন, তা আমাদের জাতির জন্য এক গভীর ও বেদনাদায়ক শিক্ষা। এই অভিজ্ঞতা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—যাতে ভবিষ্যতে আর কখনো কোনো জালেম মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে, যেন আর কখনো ফ্যাসিবাদ প্রতিষ্ঠিত না হয়, শত শত আয়নাঘর সৃষ্টি না হয়, বিচারবহির্ভূত হত্যা ফিরে না আসে—সেজন্য কেবল রাজনৈতিক অঙ্গীকারই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বিচারব্যবস্থা ও রাষ্ট্রীয় কাঠামোর মৌলিক ও গভীর সংস্কার। এই উপলব্ধি থেকেই অন্তর্বর্তী সরকার তার সংস্কার কর্মসূচিকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।

ফ্যাসিস্ট সরকারের ১৬ বছরের নিপীড়ন ও জুলাইয়ের রক্তাক্ত স্মৃতি এখনো আমাদের মধ্যে তাজা হয়ে আছে মন্তব্য করেছেন প্রধান উপদেষ্টা। তিনি বলেন, যারা ভয়াবহ নিপীড়ন ও নির্যাতন চালিয়েছে তাদের বিচার করা এবং যেন আর কেউ এ ধরনের দুঃশাসন কায়েম করতে না পারে সেটা নিশ্চিত করা আমাদের গুরুদায়িত্ব। বিচার একটা চলমান প্রক্রিয়া। একাধিক ট্রাইবুনাল বর্তমানে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। ইতোমধ্যেই একাধিক মামলার রায় ঘোষণা হয়েছে। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ফ্যাসিবাদের সময়ে দেশে যে গুমের সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল সেই ভয়াবহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারও শুরু হয়েছে। বেশকিছু মামলার বিচারিক কার্যক্রম এখন শেষের পথে। আমরা আশা করছি, আগামী দিনগুলোতেও বিচারিক প্রক্রিয়া অত্যন্ত নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছতার সঙ্গে এগিয়ে যাবে।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক

মোঃ ইউনুছ আলী

স্বত্ব © ২০২৫ মাতৃভূমির দৈনিক চিত্র

অনুসরণ করুন

যোগাযোগ : ৭১, পুস্প প্লাজা (চতুর্থ তলা), কারওয়ান বাজার, ঢাকা – ১২১৫।
ফোন : +৮৮ ০১৯২৯-৩৬৫২২৯। মেইল : dailychitro123@gmail.com

Design & Developed by : Rose IT BD