কিশোর গ্যাং, উঠতি বয়সী অপরাধপ্রবণতা ও জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিতকারী কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে চাঁদপুরে একযোগে সাঁড়াশি অভিযান চালিয়েছে জেলা পুলিশ। জেলার সব থানা ও জেলা গোয়েন্দা শাখা (ডিবি) পুলিশের সমন্বয়ে পরিচালিত বিশেষ এ অভিযানে সর্বমোট ৩৭০ জনকে আটক করা হয়েছে।রোববার (২৭ সেপ্টেম্বর ২০২৬) দিনব্যাপী জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ, জনসমাগমপূর্ণ ও অপরাধপ্রবণ এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। চট্টগ্রাম রেঞ্জ ডিআইজির নির্দেশক্রমে এবং চাঁদপুরের পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমানের দিকনির্দেশনায় জেলা পুলিশের সব ইউনিট সমন্বিতভাবে অভিযানে অংশ নেয়।
পুলিশ সূত্রে জানা যায়, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধ, উঠতি বয়সী তরুণদের অপরাধে জড়িয়ে পড়া ঠেকানো, মাদক, ইভটিজিং, মারামারি, ছিনতাইসহ বিভিন্ন অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড প্রতিরোধ এবং সার্বিক জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে জেলার বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করা হয়। অভিযানের সময় সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা, দলবদ্ধ আড্ডা ও অপরাধপ্রবণ কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ততার অভিযোগে অনেককে আটক করা হয়।
আটক ৩৭০ জনের বিষয়ে পর্যায়ক্রমে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। যাদের বিরুদ্ধে মাদক বা অন্য কোনো অপরাধে জড়িত থাকার সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, তাদের বিরুদ্ধে প্রচলিত আইনে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। আর যাদের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না, তাদের অভিভাবকদের ডেকে সন্তানের বিষয়ে সতর্ক করা হচ্ছে।
পুলিশ জানিয়েছে, যাচাই-বাছাই শেষে অপরাধে জড়িত নয় এমন কিশোরদের অভিভাবকদের কাছে ভবিষ্যতে সন্তান কোথায় যায়, কার সঙ্গে মেশে, সন্ধ্যার পর কোথায় অবস্থান করে—এসব বিষয়ে নিয়মিত খোঁজখবর রাখার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। একই সঙ্গে পড়াশোনা, খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সন্তানদের সম্পৃক্ত করার আহ্বান জানানো হয়। প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে অভিভাবকের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে তাদের ছেড়ে দেওয়া হচ্ছে।
কিশোর গ্যাং প্রতিরোধে পরিবারকেই হতে হবে প্রথম পাহারাদার
সাম্প্রতিক সময়ে দেশের বিভিন্ন জেলায় কিশোর গ্যাং ও উঠতি বয়সী অপরাধীদের বিরুদ্ধে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সমন্বিত অভিযান জোরদার হয়েছে। ২৭ সেপ্টেম্বর কুমিল্লার ১৮টি থানায় একযোগে অভিযানে ২৫৪ জন আটকের খবরও প্রকাশিত হয়েছে।
চাঁদপুরেও কিশোর অপরাধ প্রতিরোধে পুলিশের পাশাপাশি পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সামাজিক সংগঠন ও কমিউনিটি পুলিশিংয়ের সমন্বিত ভূমিকার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ, কিশোর গ্যাংয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত হওয়ার আগেই একজন কিশোরের আচরণে পরিবর্তন, অস্বাভাবিক আড্ডা, রাত করে বাইরে থাকা কিংবা অপরাধপ্রবণ বন্ধুদের সঙ্গে মেলামেশার মতো বিষয়গুলো নজরে এলে পরিবার থেকেই তাকে সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার সুযোগ তৈরি হয়।
এর আগে চাঁদপুর জেলা পুলিশের সমন্বিত অভিযানে কিশোর গ্যাং সদস্য আটকের তথ্যও প্রকাশিত হয়েছে; চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত পুলিশের বিশেষ অভিযানে ৫২২ জন কিশোর গ্যাং সদস্য আটকের কথা জেলা পুলিশের তথ্যভিত্তিক প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছিল।
অপরাধ নয়—কিশোরদের ফিরিয়ে আনতে হবে স্বাভাবিক জীবনে
পুলিশের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, কিশোর অপরাধ দমনের ক্ষেত্রে শুধু আটক বা আইনগত ব্যবস্থা নয়, অপরাধে জড়িয়ে পড়ার আগেই কিশোরদের সঠিক পথে ফিরিয়ে আনা গুরুত্বপূর্ণ। এজন্য পরিবারকে সন্তানের প্রতি নজরদারি বাড়ানোর পাশাপাশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজের দায়িত্বশীল ব্যক্তিদেরও এগিয়ে আসতে হবে।
এদিকে চাঁদপুরে কিশোর গ্যাং ও মাদকবিরোধী কার্যক্রমের পাশাপাশি তরুণদের খেলাধুলা ও ইতিবাচক সামাজিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে। সম্প্রতি জেলা পুলিশের উদ্যোগে কমিউনিটি পুলিশ কাবাডি চ্যাম্পিয়নশিপ আয়োজনের মধ্য দিয়ে তরুণদের ক্রীড়ামুখী করার বিষয়টিও সামনে এসেছে।
পুলিশের বার্তা—অপরাধ করলে ছাড় নয়,
চাঁদপুর জেলা পুলিশ জানিয়েছে, কিশোর অপরাধ, মাদক, সন্ত্রাস ও জনশৃঙ্খলা বিঘ্নিতকারী কর্মকাণ্ড প্রতিরোধে অভিযান অব্যাহত থাকবে। অপরাধের সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে; একই সঙ্গে যারা এখনো অপরাধে জড়ায়নি, তাদের পরিবার ও সমাজের সহযোগিতায় স্বাভাবিক জীবনে ধরে রাখার উদ্যোগ নেওয়া হবে।
পুলিশের পক্ষ থেকে অভিভাবকদের প্রতি বিশেষ আহ্বান জানানো হয়েছে—সন্তান কোথায় যাচ্ছে, কার সঙ্গে মিশছে এবং অবসর সময় কীভাবে কাটাচ্ছে, সে বিষয়ে নিয়মিত খোঁজ রাখুন। সময়মতো পরিবার ও সমাজের নজরদারি একটি কিশোরকে অপরাধের অন্ধকার পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে।
চাঁদপুর জেলা পুলিশ জানিয়েছে, কিশোর অপরাধ প্রতিরোধ, কিশোর গ্যাংয়ের বিস্তার রোধ, মাদক নিয়ন্ত্রণ এবং জননিরাপত্তা নিশ্চিত করতে এ ধরনের সমন্বিত অভিযান নিয়মিতভাবে অব্যাহত থাকবে।









