শনিবার | ২৪ অক্টোবর, ২০২৬ | ৮ কার্তিক, ১৪৩৩

কালিকাপুর রেলসেতু

কালিকাপুর রেলসেতুতে দুর্ঘটনা- পাংশা, কালুখালী ও রাজবাড়ীবাসীর নিরাপত্তা

কাফি খান, বিশেষ প্রতিনিধি

রাজবাড়ী জেলার কালুখালী উপজেলার কালিকাপুর রেলসেতু এলাকায় প্রাণঘাতী দুর্ঘটনার খবর পাংশা, কালুখালী ও রাজবাড়ীর মানুষের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি করেছে। প্রকাশিত সংবাদ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৯ মার্চ, ২ জুন ও ২৬ জুলাই একই এলাকায় ট্রেনের ছাদে থাকা যাত্রীর সেতুর গার্ডারে আঘাত লেগে মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। জুনের ঘটনার পর ট্রেনটি পাংশা স্টেশনে পৌঁছালে মরদেহ নামানোর খবরও প্রকাশিত হয়। এসব সংবাদ প্রতিবেদন পূর্ণাঙ্গ সরকারি দুর্ঘটনা-পরিসংখ্যান নয়, তবে একই স্থানে একই ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি জরুরি পর্যালোচনার দাবি রাখে।
সামাজিক মাধ্যমে গত ছয় মাসে ১২ জনের মৃত্যু এবং সেতুটি ১৮৭১ সালে নির্মিত হওয়ার দাবি ছড়িয়েছে। নির্ভরযোগ্য সরকারি নথি ছাড়া এ সংখ্যা বা নির্মাণ তারিখকে প্রতিষ্ঠিত তথ্য হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়। বাংলাদেশ রেলওয়ের সম্পদ ও দুর্ঘটনা সংক্রান্ত নথি এবং জিআরপি পুলিশের মামলা বা তদন্তের রেকর্ড থেকে বিষয়গুলো যাচাই করা যেতে পারে। তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯ এর অধীনে নাগরিকরা সরকারি কর্তৃপক্ষের কাছে তাদের কাছে থাকা তথ্য চাইতে পারেন।

কালিকাপুর রেলসেতুটি কালুখালী উপজেলায় হলেও রেলপথে চলাচলকারী পাংশা ও রাজবাড়ীর যাত্রীদের নিরাপত্তার সঙ্গেও এই বিষয়টি সম্পর্কিত। তাই উদ্যোগটি কোনো এক এলাকার মানুষের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পাংশা, কালুখালী ও রাজবাড়ী জেলার নাগরিক, সাংবাদিক, জনপ্রতিনিধি এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সমন্বয়ে এগিয়ে নেওয়া প্রয়োজন। এর উদ্দেশ্য দোষারোপ নয়, বরং নির্ভুল তথ্য সংগ্রহ এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কার্যকর ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে কয়েকটি ঘটনার ক্ষেত্রে নিহত ব্যক্তি চলন্ত ট্রেনের ছাদে ছিলেন এবং গার্ডারে আঘাত পেয়েছিলেন বলে উল্লেখ আছে। শুধু এই তথ্যের ভিত্তিতে সেতুর কাঠামোগত ত্রুটি, কর্তৃপক্ষের অবহেলা বা কোনো পক্ষের আইনগত দায় নির্ধারণ করা যায় না। দুর্ঘটনার কারণ নির্ধারণ তদন্ত ও প্রকৌশলগত মূল্যায়নের বিষয়। তবে একই স্থানে পুনরাবৃত্ত প্রাণহানির সংবাদ নিরাপত্তা পর্যালোচনার যথেষ্ট কারণ।

বাংলাদেশ রেলওয়ের কাছে প্রথম দাবি হওয়া উচিত একটি জরুরি প্রকৌশলগত ও পরিচালনাগত পরিদর্শন। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও রেল পরিচালন কর্মকর্তারা সেতুর অবস্থা, গার্ডার ও রেললাইনের মধ্যকার নিরাপদ ফাঁক, সতর্কবার্তা এবং দুর্ঘটনা প্রতিরোধের বিদ্যমান ব্যবস্থাগুলো পরীক্ষা করতে পারেন। পরিদর্শনের ফল অনুযায়ী নিরাপদ রেল চলাচলের বিধি মেনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নির্ধারণ করা দরকার। গার্ডার, জাল, বাধা বা অন্য কাঠামো পরিবর্তনের প্রস্তাবও অনুমোদিত প্রকৌশল নকশা ও নিরাপত্তা যাচাই ছাড়া বাস্তবায়ন করা উচিত নয়।

সেতু পরিদর্শনের পাশাপাশি ট্রেনের ছাদে যাত্রী ওঠা ঠেকানোর ব্যবস্থাও জরুরি। স্টেশন ও ট্রেনে সতর্কবার্তা, কার্যকর টিকিট পরীক্ষা, রেলওয়ে পুলিশের নজরদারি এবং জনসচেতনতামূলক প্রচার জোরদার করা যেতে পারে। কোন ব্যবস্থা স্থানীয় পরিস্থিতিতে নিরাপদ ও কার্যকর হবে, তা রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট বিভাগ নির্ধারণ করবে। যাত্রীদেরও ট্রেনের ছাদে ভ্রমণের ঝুঁকি বুঝে এ বিপজ্জনক আচরণ থেকে বিরত থাকতে হবে।

পাংশা, কালুখালী ও রাজবাড়ীর নাগরিকেরা তথ্যভিত্তিকভাবে এই উদ্যোগে অংশ নিতে পারেন। রেলওয়ের কাছে সেতুর সরকারি পরিচিতি, নির্মাণ বা সংস্কারের নথি, সর্বশেষ পরিদর্শন প্রতিবেদন এবং নির্দিষ্ট সময়ের দুর্ঘটনা-রেকর্ড চাওয়া যেতে পারে। জিআরপি পুলিশের কাছে তাদের হেফাজতে থাকা মামলা ও তদন্তের তথ্য আলাদাভাবে চাওয়া উচিত। আবেদন জমার প্রমাণ সংরক্ষণ, নির্দিষ্ট তথ্য চাওয়া এবং উত্তর না এলে তথ্য অধিকার আইনের আপিলের বিধান অনুসরণ করলে জবাবদিহি প্রতিষ্ঠার বাস্তব পথ তৈরি হয়।
নিরাপত্তা নিয়ে লিখিত আবেদন বা অভিযোগে আবেগের চেয়ে তারিখ, স্থান, সংবাদ প্রতিবেদন ও প্রত্যক্ষ প্রমাণ ব্যবহার করা বেশি কার্যকর। কর্তৃপক্ষের কাছে পরিদর্শন, অন্তর্বর্তী পদক্ষেপ এবং ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে লিখিত জবাব চাওয়া যায়। নাগরিকরা সরকারি অভিযোগ প্রতিকার ব্যবস্থার মাধ্যমেও সেবা-সংক্রান্ত অভিযোগ জানাতে পারেন। তবে আবেদন বা অভিযোগ দাখিল করলেই নির্দিষ্ট সংস্কার নিশ্চিত হয় না। আইনসম্মত প্রক্রিয়ায় জবাব ও সিদ্ধান্ত অনুসরণ করতে হবে।

এই উদ্যোগ কোনো রাজনৈতিক দল বা ব্যক্তিকে দোষারোপ করার জন্য নয়। এটি পাংশা, কালুখালী ও রাজবাড়ীর মানুষের নিরাপত্তা, নির্ভুল তথ্য এবং দায়িত্বশীল প্রশাসনিক পদক্ষেপের প্রশ্ন। প্রতিটি মৃত্যুর সঠিক হিসাব, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং পরিদর্শনের ফল প্রকাশ করা হলে জনআস্থা বাড়বে। দুর্ঘটনার পর কারণ অনুসন্ধান অবশ্যই দরকার, কিন্তু পরবর্তী প্রাণহানি ঠেকাতে আগাম ব্যবস্থা নেওয়াই জনস্বার্থের মূল দাবি।

মো. কাফি খান, লেখক ও বিশ্লেষক

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক

মোঃ ইউনুছ আলী

স্বত্ব © ২০২৫ মাতৃভূমির দৈনিক চিত্র

অনুসরণ করুন

যোগাযোগ : ৭১, পুস্প প্লাজা (চতুর্থ তলা), কারওয়ান বাজার, ঢাকা – ১২১৫।
ফোন : +৮৮ ০১৯২৯-৩৬৫২২৯। মেইল : dailychitro123@gmail.com

Design & Developed by : Rose IT BD