মঙ্গলবার | ১৪ জুলাই, ২০২৬ | ৩০ আষাঢ়, ১৪৩৩

উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা-ঘাট নয়, স্বাস্থ্য-শিক্ষা ও জীবনমানও গুরুত্বপূর্ণ: প্রধানমন্ত্রী

স্টাফ রিপোর্টার

‍প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, উন্নয়ন মানে শুধু রাস্তা-ঘাট নির্মাণ নয়; স্বাস্থ্য, শিক্ষা, শিশু চিকিৎসা, খাল খনন এবং মানুষের জীবনমানের উন্নয়নও সমান গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ ১৭ বছরের অব্যবস্থাপনায় দেশের প্রায় সব খাত ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় পৌঁছেছিল। এমন পরিস্থিতিতে দায়িত্ব নিয়েও সরকার প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী একের পর এক কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করেছে।

সোমবার (১৩ জুলাই) বিকেলে বরিশাল শিল্পকলা একাডেমিতে বিএনপির স্থানীয় নেতাকর্মীদের নিয়ে আয়োজিত সাংগঠনিক সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

তারেক রহমান বলেন, জনগণ খুব ভালো করেই জানে কী অবস্থায় বর্তমান সরকার দায়িত্ব নিয়েছে। ব্যাংকিং খাতকে দুর্বল করে দেওয়া হয়েছিল, স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছিল এবং উপজেলা পর্যায়ে চিকিৎসাসেবার অবস্থা ছিল অত্যন্ত নাজুক। একইভাবে শিক্ষা ব্যবস্থাকেও এমন পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল যে দেশের শিক্ষাগত সনদের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা ক্ষুণ্ন হয়েছে। তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষিতদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি বেকারত্ব দেখা যাচ্ছে, যা দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনার ফল।

তিনি বলেন, এসব সংকটের মূল কারণ ছিল জবাবদিহির অভাব। নিয়মিত ও অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনের মাধ্যমে জনগণের কাছে জবাবদিহি নিশ্চিত হওয়ার কথা থাকলেও গত ১৭ বছরে সেই ব্যবস্থাই ধ্বংস করে দেওয়া হয়েছিল।

সরকারের বিভিন্ন উদ্যোগের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, নির্বাচনের আগে দেওয়া প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ শুরু হয়েছে, কৃষক কার্ড কার্যক্রমও চালু হয়েছে। পরিকল্পনা ছিল বলেই দায়িত্ব গ্রহণের পরপরই এসব কর্মসূচি বাস্তবায়ন শুরু করা সম্ভব হয়েছে।

তিনি বলেন, সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পরপরই রমজান মাস শুরু হয়েছিল। সে সময় নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে রাখতে সক্ষম হয়েছে সরকার, ফলে মানুষ তুলনামূলক স্বস্তিতে রমজান কাটিয়েছে। তবে এর পরপরই মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বেড়ে যায় এবং সরবরাহ ব্যাহত হয়। এর ফলে বাংলাদেশকে অতিরিক্ত প্রায় আড়াই বিলিয়ন মার্কিন ডলার, অর্থাৎ প্রায় ২৫ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করতে হয়েছে।

পূর্ববর্তী সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, পদ্মা সেতু নির্মাণে প্রায় ৫৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয় হয়েছে, অথচ ভারতের ভূপেন হাজারিকা সেতু নির্মাণে খরচ হয়েছে মাত্র ১৪ হাজার কোটি টাকা। একইভাবে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র প্রকল্পেও অস্বাভাবিক ব্যয় হয়েছে বলে তিনি অভিযোগ করেন।

তিনি আরও বলেন, অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময় অর্থনীতিবিদ ড. দেবপ্রিয় ভট্টাচার্যের প্রকাশিত শ্বেতপত্রে গত ১৭ বছরে প্রতি বছর বিপুল পরিমাণ অর্থ বিদেশে পাচারের তথ্য উঠে এসেছে। এমন একটি অর্থনৈতিক বাস্তবতায় সরকারকে দায়িত্ব নিতে হয়েছে।

উন্নয়নের পরিকল্পনা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, উপজেলা পর্যায়ের ৫১ শয্যার হাসপাতালগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, উপজেলা স্বাস্থ্যব্যবস্থার ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান। পরে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার আমলে হাসপাতালগুলো ৫১ শয্যায় উন্নীত করা হয়েছিল। বর্তমান সরকার সেগুলোকে ১০১ শয্যায় উন্নীত করবে। পাশাপাশি সারা দেশে এক হাজার শিশু হাসপাতাল প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি।

তিনি বলেন, জলাবদ্ধতা এখন দেশের বড় সমস্যা। শুধু ফ্লাইওভার নির্মাণ করলেই উন্নয়ন হয় না। খাল ও ড্রেন ভরাট হওয়ার কারণেই ঢাকা-চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন শহরে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হচ্ছে। তাই টেকসই উন্নয়নের জন্য পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়ন জরুরি।

দলীয় নেতাকর্মীদের উদ্দেশে তারেক রহমান বলেন, গত ১৭ বছর নির্যাতন, গুম, হত্যা ও মামলার মধ্যেও নেতাকর্মীরা দলকে টিকিয়ে রেখেছেন। তখন সবাই ঐক্যবদ্ধ ছিলেন। এখন সেই ঐক্য আরও বেশি প্রয়োজন। তিনি বলেন, দলের ভেতরে কোনোভাবেই হাইব্রিড বা অনুপ্রবেশকারীদের জায়গা দেওয়া যাবে না। তৃণমূল নেতাকর্মীদেরই এ বিষয়ে সবচেয়ে বেশি সতর্ক থাকতে হবে।

স্থানীয় সরকার নির্বাচন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, বিএনপি অবশ্যই স্থানীয় সরকার নির্বাচন করবে। তবে তার আগে সাংগঠনিক প্রস্তুতি সম্পন্ন করতে হবে। বর্ষা শেষে আলোচনা করে নির্বাচনের সময় নির্ধারণ করা হবে। স্থানীয় পর্যায়ে নেতাকর্মীদের পারস্পরিক আলোচনার মাধ্যমে চেয়ারম্যান, সদস্য এবং দলীয় নেতৃত্ব নির্ধারণের আহ্বান জানান তিনি।

তিনি বলেন, যারা এক যুগেরও বেশি সময় ধরে দলকে সময় দিয়েছেন, অর্থ ব্যয় করেছেন এবং নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করেছেন, তাদের ত্যাগের মূল্যায়ন করেই দলকে সামনে এগিয়ে নেওয়া হবে।

সামনে হিন্দু সম্প্রদায়ের একটি বড় ধর্মীয় উৎসবের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, যেকোনো মূল্যে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে উৎসব উদ্‌যাপন নিশ্চিত করতে হবে। কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতে দেওয়া যাবে না এবং কেউ যেন পরিস্থিতির সুযোগ নিতে না পারে, সে বিষয়ে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।

তিনি অভিযোগ করেন, জাতীয় নির্বাচনের আগে যেমন বিভিন্ন ষড়যন্ত্র হয়েছিল, তেমনি এখনো দেশি-বিদেশি বিভিন্ন মহল ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এসব মোকাবিলায় দলকে আরও সুসংগঠিত করার পাশাপাশি শক্তিশালী সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।

তারেক রহমান বলেন, গত ১৭ বছর ধরে উন্নয়নের নামে যা হয়েছে, তার বড় অংশই ছিল দুর্নীতি ও লুটপাট। প্রকৃত উন্নয়ন হয়নি; বরং অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে। তিনি বলেন, মতপার্থক্য থাকতেই পারে, কিন্তু তা যেন দলের ঐক্য নষ্ট না করে। ঐক্য অটুট থাকলে কোনো ফ্যাসিস্ট শক্তি বা ষড়যন্ত্রকারী গোষ্ঠী সফল হতে পারবে না।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, আপনাদের মধ্যে ঐক্যে ফাটল তৈরি হলে, তখনই তারা সুযোগ নিবে। মানুষ আপনাদের ওপর আস্থা পায়, আপনি বিএনপি করেন বলেই বলে ১০০টা মানুষ আপনাকে সালাম দেয়। আপনাকে মানুষ যে সম্মান দেয়, এটা আল্লাহর রহমত। এটা নষ্ট করবেন না।

তিনি আরও বলেন, অযথা জনপ্রিয়তার জন্য অবাস্তব প্রতিশ্রুতি দেওয়া যাবে না। সংসদে আগেও তিনি বলেছিলেন, যে চেয়ারে তিনি বসেছেন, সেই দায়িত্বই তাকে জনপ্রিয়তার চেয়ে সঠিক সিদ্ধান্তকে অগ্রাধিকার দিতে শিখিয়েছে।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, যা পারব না, তা বলব না। দেশের নানা সমস্যা রয়েছে, কিন্তু বাস্তবতা বিবেচনা করেই জনগণকে প্রতিশ্রুতি দিতে হবে। বিএনপি যখনই রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে এসেছে, তখনই দেশের উন্নয়নে আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করেছে।

বক্তব্যের শেষদিকে তিনি আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও জাতীয় নির্বাচনের মতোই ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানিয়ে বলেন, ঐক্য, শৃঙ্খলা ও সাংগঠনিক শক্তিই বিএনপির সবচেয়ে বড় সম্পদ। বিগত নির্বাচনে যেভাবে সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে দলকে জিতিয়ে নিয়ে এসেছেন, ঠিক সেভাবে আগামী স্থানীয় সরকার নির্বাচনেও সবাই ঐক্যবদ্ধ থেকে দলকে জিতিয়ে নিয়ে আসবেন বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন প্রধানমন্ত্রী।

আপনার মন্তব্য

Subscribe
Notify of
guest
0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments

অনুসরন করুন

সর্বশেষ খবর

সম্পাদক

মোঃ ইউনুছ আলী

স্বত্ব © ২০২৫ মাতৃভূমির দৈনিক চিত্র

অনুসরণ করুন

যোগাযোগ : ৭১, পুস্প প্লাজা (চতুর্থ তলা), কারওয়ান বাজার, ঢাকা – ১২১৫।
ফোন : +৮৮ ০১৯২৯-৩৬৫২২৯। মেইল : dailychitro123@gmail.com

Design & Developed by : Rose IT BD