আজ শনিবার ২৪ শে অক্টোবর দুপুরে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল( মমেকহা)আকস্মিক পরিদর্শনে আসেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী।স্বাস্থ্য খাতের উন্নয়নে আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার টেন্ডার আহ্বান করা হবে বলে জানিয়েছেন স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মোঃ সাখাওয়াত হোসেন। একই সঙ্গে দেশে পাঁচটি রোবটিক সার্জারি মেশিন আনার উদ্যোগ, ক্যানসার চিকিৎসায় রেডিওথেরাপি মেশিন সরবরাহ এবং চিকিৎসক-নার্স নিয়োগের পরিকল্পনার কথা জানিয়েছেন তিনি। হসপিটাল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে এসব কথা বলেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এ সময় হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ, লেবার ও ডেঙ্গু ওয়ার্ড, রান্নাঘর এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিদর্শন করেন তিনি। হাসপাতালের নিচতলায় ময়লা-আবর্জনার স্তূপে ক্যানুলা ও সিরিঞ্জসহ চিকিৎসাসামগ্রী পড়ে থাকতে দেখে অসন্তোষ প্রকাশ করেন মন্ত্রী। বিষয়টি তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেন তিনি।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, স্বাস্থ্য খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা দূর করে সাধারণ মানুষের কাছে মানসম্মত চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দিতে সরকার কাজ করছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর বিভিন্ন সমস্যা চিহ্নিত করে সমাধানের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এক দিন বা এক মাসে দূর করা সম্ভব নয়। এ জন্য পরিকল্পিত উদ্যোগ, জবাবদিহি ও সংশ্লিষ্ট সবার আন্তরিকতা প্রয়োজন।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, আগামী ১৫ থেকে ২০ দিনের মধ্যে স্বাস্থ্য খাতে ১৬ হাজার কোটি টাকার বেশি টেন্ডার আহ্বানের পরিকল্পনা রয়েছে। হাসপাতালের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি, চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন ও অবকাঠামোগত উন্নয়নে এসব উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি দেশে পাঁচটি রোবটিক সার্জারি মেশিন আনার পরিকল্পনা রয়েছে। ক্যানসার রোগীদের উন্নত চিকিৎসা নিশ্চিত করতে রেডিওথেরাপি মেশিন সরবরাহের উদ্যোগও নেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তি ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিত করা গেলে রোগীদের চিকিৎসাসেবা আরও উন্নত হবে। একই সঙ্গে সরকারি হাসপাতালগুলোতে বিদ্যমান সমস্যা চিহ্নিত করে সেগুলো সমাধানের চেষ্টা চলছে।
মমেক হাসপাতালে রোগীর অতিরিক্ত চাপের বিষয়টি তুলে ধরে মন্ত্রী বলেন, দেশের জনসংখ্যার তুলনায় চিকিৎসকের সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় কম। ফলে চিকিৎসকদের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে, যা চিকিৎসাসেবার স্বাভাবিক কার্যক্রমকে কঠিন করে তুলছে।
তিনি বলেন, একটা মৃত্যুর জন্য আমাদের সবারই মন কাঁদে। কিন্তু ১৮ কোটি মানুষের জন্য ডাক্তার আছে কয়জন? একজন চিকিৎসক যেখানে ৫০ জন রোগী দেখতে পারেন, সেখানে তাঁকে ২৫০ থেকে ৩০০ রোগী দেখতে হচ্ছে। এতে চিকিৎসক হাঁপিয়ে ওঠেন। অতিরিক্ত চাপের কারণে স্বাভাবিকভাবে কাজ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে চিকিৎসকদের ওপর চাপ থাকলেও দায়িত্ব পালনে কোনো ধরনের অবহেলা গ্রহণযোগ্য হবে না বলে জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, রোগীরা যেন যথাযথ চিকিৎসাসেবা পান, তা নিশ্চিত করতে হবে। চিকিৎসকদের উপস্থিতি, দায়িত্ব পালন ও চিকিৎসাসেবার মান পর্যবেক্ষণ করা হবে। কোনো ধরনের গাফিলতির অভিযোগ পাওয়া গেলে তা যাচাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অনুপস্থিত চিকিৎসকদের বিষয়ে ব্যবস্থা
মমেক হাসপাতাল পরিদর্শনের সময় কয়েকজন চিকিৎসককে কর্মস্থলে অনুপস্থিত পাওয়া গেছে বলে জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। তাঁদের দায়িত্ব পালনের রোস্টার তালিকা সংগ্রহ করা হয়েছে। অনুপস্থিতির কারণ যাচাই করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
হাসপাতালের বিভিন্ন বিভাগ পরিদর্শনের সময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও ব্যবস্থাপনার বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন মন্ত্রী। বিশেষ করে ব্যবহৃত ও অব্যবহৃত চিকিৎসাসামগ্রীর যথাযথ ব্যবস্থাপনা, হাসপাতালের বর্জ্য অপসারণ এবং রোগীদের নিরাপদ পরিবেশ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন তিনি।
শর্ত না মানলে বেসরকারি ক্লিনিকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
সরকারি হাসপাতালের এক কিলোমিটারের মধ্যে নতুন ক্লিনিক স্থাপনের বিষয়ে বিধিনিষেধের কথা উল্লেখ করে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বলেন, বেসরকারি ক্লিনিক ও হাসপাতালগুলো নির্ধারিত নিয়ম ও শর্ত মেনে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করা হবে।
তিনি বলেন, কোনো প্রতিষ্ঠানে প্রয়োজনীয় লেবার রুম না থাকা, চিকিৎসাসেবায় অব্যবস্থাপনা কিংবা যথাযথ সেবা না দেওয়ার কারণে রোগীর জীবন ঝুঁকির মুখে পড়ার মতো ঘটনা ঘটলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। নির্ধারিত শর্ত ও বিধিবিধান না মানলে আইন অনুযায়ী প্রতিষ্ঠান বন্ধের পদক্ষেপও নেওয়া হবে।
এর আগে শনিবার সকালে ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পরিদর্শন করেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। ফুলপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অব্যবস্থাপনা ও ময়লা-আবর্জনা দেখতে পেয়ে তিনি অসন্তোষ প্রকাশ করেন। হাসপাতালের বাথরুম সংস্কার ও পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেন।
তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে এখনো ইনডোর সেবা চালু না হওয়ায় বিষয়টি দ্রুত সমাধানের আশ্বাস দেন মন্ত্রী। আগামী সপ্তাহের মধ্যে চিকিৎসক নিয়োগ দিয়ে ইনডোর সেবা চালুর উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে জানান তিনি।
এ ছাড়া ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সকে ১৫১ শয্যায় উন্নীত করার পরিকল্পনার কথা তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী। এসব হাসপাতালে ডায়ালাইসিস, ফিজিওথেরাপি, মাতৃস্বাস্থ্যসেবা এবং শিশুদের জন্য পৃথক শয্যার ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা রয়েছে। উপজেলা পর্যায়ে উন্নত চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করা গেলে মমেক হাসপাতালের ওপর রোগীর চাপ কমবে বলে মনে করেন তিনি।
স্বাভাবিক প্রসবের হার বাড়াতে দেশে ২৫ হাজার মিডওয়াইফ নিয়োগের পরিকল্পনার কথাও জানান স্বাস্থ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি পাঁচ হাজার চিকিৎসক নিয়োগ এবং নার্স নিয়োগের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, ইউনিয়ন পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা আরও সম্প্রসারণের লক্ষ্যে পুরোনো কমিউনিটি ক্লিনিকগুলোকে ফ্যামিলি ওয়েলবিং সেন্টারে রূপান্তরের পরিকল্পনা রয়েছে। এতে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা, মাতৃস্বাস্থ্য ও শিশুস্বাস্থ্যসেবা আরও সহজলভ্য হবে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রীর এসব উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে সরকারি হাসপাতালের চিকিৎসাসেবার মানোন্নয়ন, আধুনিক চিকিৎসা প্রযুক্তির ব্যবহার এবং উপজেলা পর্যায়ে স্বাস্থ্যসেবা সম্প্রসারণে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা আশা করছেন।
পরিদর্শনকালে ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মোঃ সাইফুর রহমান, পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান, মমেক হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোঃ জাকির হোসেন, ময়মনসিংহ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোতাহার হোসেন তালুকদার, বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডাঃ প্রদীপ কুমার সাহা, ডাঃ আসাদুজ্জামান রতনসহ হাসপাতালের বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী ও রাজনৈতিক নেতারা উপস্থিত ছিলেন।









