বাগেরহাটের মোংলা থেকে দুই মাসের বেশি সময় ধরে নিখোঁজ মিরাজ শেখকে ১৫ দিনের মধ্যে আদালতে সশরীরে হাজির করার নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। তাকে বেআইনিভাবে আটকে রাখা হয়নি— তা নিশ্চিত করতেই আদালত এই আদেশ দিয়েছেন।
রোবাবার (১২ জুলাই) নিখোঁজ মিরাজের বাবা মো. মোস্তফা শেখের করা এক রিট আবেদনের (হেবিয়াস কর্পাস) শুনানি নিয়ে বিচারপতি আহমেদ সোহেল ও বিচারপতি ফাতেমা আনোয়ারের হাইকোর্ট বেঞ্চ এই আদেশ দেন।
পেশায় জেলে ও ভাড়ায়চালিত মোটরসাইকেল চালক মিরাজ শেখের (৩০) বাড়ি মোংলার চিলা ইউনিয়নের জয়মনির ঘোল এলাকায়। পরিবারের অভিযোগ, গত ১০ এপ্রিল সন্ধ্যায় কোস্টগার্ডের সদস্যরা তাকে তুলে নিয়ে যায়।
আদালতে রিট আবেদনের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম শাহীন।
রিটে স্বরাষ্ট্রসচিব, কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক, পুলিশের মহাপরিদর্শক, র্যাবের মহাপরিচালক, বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ ৯ জনকে বিবাদী করা হয়েছে।
শুনানি শেষে আইনজীবী মুজাহিদুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, আদালত রুল জারির পাশাপাশি আগামী ১৫ কার্যদিবসের মধ্যে মিরাজ শেখকে সশরীরে হাইকোর্ট বিভাগে উপস্থাপন করার নির্দেশ দিয়েছেন। একইসঙ্গে তিনি কোথায় এবং কী অবস্থায় আছেন, সে বিষয়টিও আদালতকে জানাতে বলা হয়েছে
ঘটনার বর্ণনায় এই আইনজীবী বলেন, প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, আলামিন নামের এক চা দোকানির সামনে থেকে কোস্টগার্ডের সদস্যরা মিরাজকে স্পিডবোটে করে তুলে নিয়ে যায়। তার মোটরসাইকেলটি ওই দোকানেই রাখা ছিল। কিছুদিন পর কোস্টগার্ড সদস্যরা এসে সেটিও নিয়ে যায়।
হাইকোর্ট উপস্থিত মিরাজের স্ত্রী মুক্তা বেগম সাংবাদিকদের কাছে সেদিনের ঘটনা বর্ণনা দিয়ে বলেন, ১০ এপ্রিল শুক্রবার সন্ধ্যা ৭টার দিকে জয়মনি ঠোটা থেকে কোস্টগার্ড আমার স্বামীকে তুলে নিয়ে যায়। খবর পেয়ে আমি ছুটে যাই। সেখানে তাকে ২০-৩০ মিনিট আটকে রেখে মুখে গামছা দিয়ে প্রচণ্ড মারধর করা হয়। পরে মোংলা থেকে স্পিডবোট এনে তাকে নিয়ে যাওয়া হয়।
কোস্টগার্ডের স্থানীয় এক কর্মকর্তার (কন্টিনজেন্ট কমান্ডার-সিসি) সঙ্গে আলাপের প্রসঙ্গ টেনে মুক্তা বলেন, আমি এলাকার মেম্বারের কাছে যাই। মেম্বারকে নিয়ে সিসির সঙ্গে কথা বলি। তিনি স্বীকার করেন যে— ডাকাতির সোর্স হিসেবে সন্দেহজনকভাবে মিরাজকে তারা ধরেছেন। দুই-তিন দিন পর ছেড়ে দেওয়া হবে, আর দোষ পেলে আইনের হাতে তুলে দেওয়া হবে।
পরদিন দিগরাজ ঘাঁটিতে স্বামীর খোঁজে যাওয়ার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, সেখানে যাওয়ার পর প্রথমে তারা মিরাজ নামে একজন আছে বলে স্বীকার করে। কিন্তু একটু পরে দুই-তিনজন কোস্টগার্ড সদস্য বেরিয়ে এসে বলেন— মিরাজ নামে কোনো আসামি তাদের কাছে নেই।
অথচ আমি গেটের সামনে দাঁড়িয়ে শুনেছি, ভেতর থেকে বলা হচ্ছে— মিরাজকে খাবার খেতে দাও, ওকে নিয়ে অপারেশনে যেতে হবে,’ যোগ করেন মুক্তা।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে ক্ষোভ প্রকাশ করে মুক্তা বেগম বলেন, আমার একটা সন্তান আছে। আমি এর বিচার চাই। আমার স্বামী যদি কোনো অপরাধ করে থাকে, তাকে জেলে দিক, আইনের হাতে দিক। কিন্তু আমার স্বামী কেন গুম হবে? সে কী অপরাধ করেছে?
প্রত্যক্ষদর্শী চা দোকানি আলামিনও জানিয়েছেন, ১০ এপ্রিল তার জিম্মায় মোটরসাইকেল রেখে মিরাজকে নিয়ে যাওয়া হয়।
স্বামীর কোনো খোঁজ না পেয়ে গত ২৩ এপ্রিল মোংলা থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন মুক্তা খাতুন।
এরপর গত ৮ মে মিরাজের সন্ধান চেয়ে মোংলা প্রেসক্লাবে সংবাদ সম্মেলন করে পরিবার।
এর আগে, ঘটনার তদন্ত ও নিখোঁজ স্বামীর সন্ধান চেয়ে গত ১৪ মে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, কোস্টগার্ডের মহাপরিচালক, পুলিশের মহাপরিদর্শক, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের জননিরাপত্তা বিভাগের সচিব, জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারসহ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন দপ্তরে চিঠিও পাঠিয়েছিলেন মুক্তা খাতুন। সবশেষ প্রতিকার পেতে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয় পরিবার।









